মুক্তিযুদ্ধ
যুদ্ধগাথা একাত্তর
এনায়েত কবীর
গুলির গন্তব্য থেকে
লুৎফুল হোসেন

প্রবন্ধ
চিত্রকর কমলকুমার মজুমদার
শেখ মিরাজুল ইসলাম

গল্প
মোজাফ্ফর হোসেন
সাদিয়া সুলতানা
আবু নাসের

নিবন্ধ
বিলেতে মিশুক মুনীরের সঙ্গে
শাকুর মজিদ

উপন্যাস
রূপে তোমায় ভোলাবো না
সৈয়দ আনওয়ারুল হাফিজ

গদ্য
বিজ্ঞাপনের ভাষা
নাজিব তারেক

বিশ্বসাহিত্য
মার্কেজ ও ক্যাস্ট্রো
লিওনার্ড কোহেন
আকিল জামান ইনু

বিশেষ রচনা
হোমারের জন্য প্রশস্তিগাথা
অনুবাদ: মাসরুর আরেফিন

সমকালীন ইতালিয়ান ফিকশন
সোহরাব সুমন

শ্রদ্ধাঞ্জলি
 সৈয়দ শামসুল হক

জীবনকথা
প্রজন্ম নক্ষত্র
রুখসানা কাজল

ভ্রমণ
হোটেল ডে আর্টস
মঈনুস সুলতান

টরন্টোর চিঠি
শামীম আহমেদ

অস্ট্রেলিয়ার চিঠি
ফজল হাসান

এবং
গুচ্ছ কবিতা
নাহার মনিকা

৯ বর্ষ ৫ সংখ্যা
ডিসেম্বর ২০১৬

লেখক-সংবাদ : প্রতি রাতে তাঁর সঙ্গী কবিতা, আর দিনমান দুনিয়ার তাবৎ কবির ঠিকুজি সন্ধানে রত ওমর শামস * মন সরানোর জো নেই হাবীবুল্লাহ সিরাজীর নয়া কিতাব ‘জো’ থেকে * একজন কমলালেবু নিয়ে বইমেলায় আসছেন শাহাদুজ্জামান; তাঁর অপর গ্রন্থ ‘ইলিয়াসের সুন্দরবন ও অন্যান্য’ * ফরিদ কবিরের ‘জীবনের গল্প’ লেখ্যরূপে বারবার বদলে চলেছে * রাশিয়ার ইতিহাস খুঁড়ে মশিউল আলম এঁকে চলেছেন ‘লাল আকাশ’, কমপক্ষে ৫০০ পৃষ্ঠার উপন্যাস হবে এটি * দারুণ সব অর্জন এলেও বছরভর শ্র“তিযন্ত্র যন্ত্রণা করেছে শাহীন আখতারের, এরই মাঝে ঘটে চলেছে ‘স্মৃতির ছায়াপাত’* নির্বাচিত গল্প সংকলনের কাজ গোছানো শেষ রাশিদা সুলতানার * ফারহানা মান্নানের ভিন্নধর্মী বই ‘একুশ শতক ও অন্য শিক্ষার সন্ধানে’ বইটি প্রকাশ করছে আদর্শ * হাসানআল আব্দুল্লাহর কবিতার জন্য হোমার ইয়োরোপিয়ান মেডেল প্রাপ্তি এবং চীন সফরÑ দুটোই দারুণ খবর * ফয়জুল ইসলাম নতুন গল্পের মুখ দেখছেন ‘আয়না’-য় * জোড়া কাব্য নিয়ে মেলায় ঢুকবেন ইমতিয়াজ মাহমুদ *





কথাসাহিত্যিক শাহাদুজ্জামানের সঙ্গে কথোপকথন
জীবনকে ব্যবচ্ছেদ করাই আমার কাজ
সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন মাসউদুল হক


শাহাদুজ্জামান বর্তমান বাংলা কথাসাহিত্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লেখক। তবে শুধু কথাসাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ না বলে শিল্প-সাহিত্য জগতের একজন গুরুত্বপূর্ণ লেখক বলাই শ্রেয়। কেননা, কথাসাহিত্যিক হিসেবে পরিচিতি বিস্তৃত হলেও তিনি চলচ্চিত্র, অনুবাদ, সাক্ষাৎকার গ্রহণ, নাটক, প্রবন্ধ, কলাম লেখা ইত্যাদি প্রায় সব ধারায় বিচরণ করেছেন। শিল্প-সাহিত্যের বিভিন্ন ধারায় বিচরণের প্রভাবে তাঁর কথাসাহিত্য স্বতন্ত্র্য একটি ধারায় প্রসারিত হয়েছে। নিজের মধ্যে বিরাজমান অপরিসীম কৌতূহল নিবৃত্তির জন্য তিনি সমাজকে যেমন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন সে-ই সাথে প্রতিনিয়ত জ্ঞান অন্বেষণে নিজেকে ব্যাপৃত রেখেছেন। ফলে সময়ের সাথে সাথে তার দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটেছে, ভাবনার দিগন্ত বিস্তৃত হয়েছে । এই পরিবর্তনের প্রভাব তার রচনায় খুব স্পষ্ট হয়ে দেখা যায়। ১৯৯৬ সাল থেকে লেখক শাহাদুজ্জামানকে ব্যক্তিগতভাবে অনুসরণ করছি। শাহাদুজ্জামান নিজে যেমন লেখার মধ্যে দিয়ে কোন লেখককে পরিপূর্ণভাবে আবিষ্কারের চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হলে তার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করতেন, এ সাক্ষাৎকারটি সে ঘটনারই পুনরাবৃত্তি বলা যায়। শুধু সাক্ষাৎকার প্রদানকারি এবং সাক্ষাৎকার গ্রহনকারির স্থান পরিবর্তন ঘটেছে।

 
মাসউদুল হক : আপনার লোখালেখির শুরুর সময়টা কবে বলে মনে করেন?
শাহাদুজ্জামান : আমি লিটল ম্যাগাজিনে লেখা শুরু করি ১৯৮৩/৮৪ দিকে। মূলত অনুবাদ, প্রবন্ধ এসব লিখেছি। পরে গল্প লেখা শুরু করি মুলত নব্বুই দশকের গোড়ার দিকে। আমার প্রথম গল্পের বই বের হলো  ১৯৯৬ তে। 
মাসউদুল হক :  আপনি যে সময় সাহিত্য রচনা শুরু করেন তখন সাহিত্যের বিষয় হিসেবে গ্রামীণ সমাজ ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারাতে শুরু করেছে।  নতুন যারা কাজ শুরু করেছেন তাদের সাহিত্য রচনায় মূল উপজীব্য বিষয় হিসেবে মধ্যবিত্ত সমাজ বা তার সুখ দুঃখ, আনন্দ বেদনা Ñ এইসব নিয়ে কাজ করা শুরু হয়েছে। তেমন একটি প্রেক্ষাপটে আপনি কিন্তু একেবারে একটা ভিন্ন ধারায় লেখা শুরু করলেন। এটা কি সচেতনভাবে এড়িয়ে গেলেন নাকি আপনার কাছে মনে হয়েছে, নতুন কিছু লিখবো?
শাহাদুজ্জামান : সাহিত্যে গ্রামীণ সমাজের গুরুত্ব সেভাবে কখনই কিন্তু আসলে হারায়নি। তবে আমি কেন এই বিশেষ ধারার লেখা লিখতে শুরু করলাম সেটার উত্তর দিতে গেলে আমার লেখালেখির সামগ্রিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করতে হবে। যেটা বললাম যে আমি লেখা শুরু করেছিলাম অনুবাদ দিয়ে। ইন্টেলেকচুয়াল সব বিষয় অনুবাদ করতাম তখন। মুলত মার্ক্সিষ্ট এসথেটিক্স নিয়ে। লেখক হবার জন্য এসব লেখা তখন অনুবাদ করিনি। আমি তখন মেডিকেল কলেজের ছাত্র। আমার তখন একাধারে রাজনীতি আর সাহিত্য উভয় ব্যাপারেই সমান আগ্রহ। এদুটার মধ্যে কি সম্পর্ক সেটা বোঝার জন্য নানারকম ইংরাজী লেখাপত্র পড়তাম। একসময় মনে হলো এগুলো অনুবাদ করে অন্যদের সাথে শেয়ার করা দরকার। এটা বিশেষভাবে মনে হলো কারণ আমি তখন বামপন্থী একদল তরুণ রাজনৈতিক কর্মীর সাথে ঘোরাঘুরি করতাম। দেখতাম তাদের মিটিং মিছিলে যত আগ্রহ জ্ঞানতাত্ত্বিক ব্যাপারে তত আগ্রহ নাই। কিন্তু তারা রাজনীতি শিল্প নিয়ে নানা কথাবার্তা বলতো। তাদের সাথে তর্ক বিতর্ক করতে গিয়েই আমি এইসব লেখাপত্র পড়তে শুরু করি এবং মনে হয় অনুবাদ করলে এসব বিষয়ে আন্তর্জাতিক কি সব চিন্তাভাবনা হচ্ছে সেটা হয়তো অনেকের জানার সুযোগ হবে। সুতরাং ঠিক লেখক হবার মোটিভেশন থেকে না , একেবারে ভিন্ন একটা মোটিভেশন থেকে লিখতে শুরু করা। অবশ্য একপর্যায়ে টের পেলাম সক্রিয় রাজনীতি  আমার কাজের জায়গা না। আমি শিল্প সাহিত্যের নানা মিডিয়ার ব্যাপারে খুব কৌতূহলী হয়ে উঠলাম। আমি আশির দশকে ফিল্ম, নাটক, পেইন্টিং, মিউজিক এসব মিডিয়ার সাথে খুবই সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলাম। তো গল্প যখন লিখতে শুরু করেছি তাতে অন্যান্য সব শিল্প মাধ্যমের সাথে আমার যে যোগাযোগ, রাজনীতির সাথে যে যোগাযোগ তার একটা প্রভাব পড়েছে। নানা মিডিয়ায় এক্সিপেরিমেন্টাল যেসব কাজ হয়েছে সেগুলো আমাকে ইন্সপায়ার করেছে। আমার লেখার নিরীক্ষাধর্মিতার সাথে এইসব অভিজ্ঞতার একটা সম্পর্ক আছে।
মাসউদুল হক :   তাহলে কি আমরা ধরে নিব আপনার প্রস্তুতিপর্ব বা আত্ম-নির্মাণকাল গত-শতকের আশি’র দশক?
শাহাদুজ্জামান : আশির দশকের মাঝামাঝি আমি লিখতে শুরু করি কিন্তু প্রস্তুতিপর্ব ঠিক কখন শুরু হয় সেটা তো এমন সরাসরি বলা যাবে না। আর আমার ক্ষেত্রে তো বলেছি যে লেখক হব এটা ভেবে কোন সচেতন প্রস্তুতি ছিলো না। আমার পরিবারের ভেতর সাহিত্য, গান বাজনা ইত্যাদির চর্চা ছিলো। ফলে শুরুটা সেখান থেকে। আমি ক্যাডেট কলেজে পড়েছি, সেটা রেজিমেন্টেড লাইফ তুমি জানো, কিন্তু সেখানে দুএকজন শিক্ষক, বন্ধু এদের সুত্র ধরে সাহিত্যের আগ্রহটা জিইয়ে থেকেছে। তবে ক্যাডেট কলেজ থেকে বেরিয়ে মুক্ত জীবনে এসে বলা যায় প্রথম শিল্পসাহিত্য নিয়ে মশগুল হওয়ার সুযোগ আসলো। আমি মেডিকেলে পড়লেও দেখলাম আমার মন পড়ে থাকে গান বাজনা, সাহিত্য,  নাটক, ফিল্ম  এগুলোর দিকে। চিটগাংয়ে থাকতে কলেজের অনুষ্ঠানে গান বাজনা, আবৃত্তি ইত্যাদিতে নিয়মিত অংশ নিতাম। চিটাগাং রেডিওতে গান করতাম, চিটাগাং ফিল্ম সোসাইটির জেনারেল সেক্রেটারী ছিলাম, এছাড়া অঙ্গন গ্র“প থিয়েটারের সাথেও যুক্ত ছিলাম, যুক্ত ছিলাম ‘সময়’ পেইন্টার্স গ্র“পের সাথে। মোটকথা  শিল্পসাহিত্যের সবগুলো মিডিয়ার সাথে একটা সক্রিয় যোগাযোগ আমার ছিলো তখন। আর্ট, কালচারের জগতের একধরনের ঘোর তৈরী হয়েছে তখন বলতে পারো। নানারকম বইপত্র পড়তাম, প্রচুর ফিল্ম দেখতাম।  চিটাগাং আঁলিয়স ফ্রসেস তখন প্রতি সপ্তাহে ফিল্ম দেখাতো, চিটাগাংয়ে যখন থেকেছি আমি কোন সপ্তাহ মিস দিয়েছি বলে মনে পড়ে না। তারপর তখন ভিসিআর এলো। কত রকম কসরত করে তখন ভারতীয় মাস্টারদের ছবি দেখতাম। আমি নাটকেরও নিয়মিত দর্শক ছিলাম। চিটাগাং থেকে গিয়ে ঢাকাতে নাটক দেখতাম। আশির দশকে এমন কোন প্রধান নাটক সম্ভবত নাই যেটা আমি দেখিনি। যাহোক আমি একসময় ফিল্ম মেকিংয়েও জড়িত হয়ে পড়েছিলাম। ঢাকায় তখন ফিল্ম এপ্রিসিয়েশন কোর্স শুরু হলো, সেটা করলাম। তারেক মাসুদ একই ব্যাচে কোর্সটা করেছিলো, আমরা একসঙ্গে কিছু কাজও করেছিলাম শুরুতে।  যাহোক, সেসব অন্য কাহিনী। আরেকটা লেখায় আমি সেসময়টা নিয়ে লিখেছি। এসব কথা বলছি কারণ আমার প্রস্তুতিপর্র্বের কথা যদি বলো তাহলে আমার লেখালেখি শুরুর আগের এইসব কর্মকাণ্ডগুলোকে স্মরণ করতে হয়। আমি এসময় বিশেষ করে রাজনীতি আর শিল্পসাহিত্যের সম্পর্ক নিয়ে খুব আগ্রহী হয়ে উঠেছিলাম। আগেই বলেছি এসব নিয়ে লিটল ম্যাগাজিনে লিখতে শুরু করলাম। মূলত অনুবাদ। বলতে পারো বিখ্যাত সব লেখকদের লেখা অনুবাদ করে আসলে তাদের আড়ালে গিয়ে নিজের ভেতরের প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজেছি। এরপর ধরো শিল্প সাহিত্য যারা সৃষ্টি করে তাদের ক্রিয়েটিভ প্রসেসটার ব্যাপারে আমার আগ্রহ তৈরী হলো। সেই সুত্র ধরে কিছু ক্রিয়েটভ মানুষের ইন্টারভিউ করি। আমি আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, হাসান আজিজুল হক, এস এম সুলতান এদের ইন্টারভিউ করেছি। সেগুলো আমার কথা পরম্পরা বইটাতে আছে। কিন্তু একটা পর্যায়ে এসে অনুভব  করলাম আমার যে নিজের অভিজ্ঞতাগুলো হচ্ছে, নিজে যে নানারকম দ্বন্দ্ব, সংশয়, প্রেম, দ্বিধা এই সব ঘটনার মধ্যে যাচ্ছি সেগুলোতে এই অনুবাদের ভিতর দিয়ে বা অন্যের সাক্ষাৎকারের ভেতরও প্রকাশ করা যাবে না। আমার নিজের কথাগুলো বলার একটা জায়গা তৈরির জন্য আমি প্রথম গল্প লিখি।  সে গল্পটার নাম, ‘অগল্প‘। তুমি পড়েছ নিশ্চয়ই। লক্ষ করেছ যে ওটা আসলে ঠিক প্রচলিত ন্যারেটিভের গল্প না। বরং বলা যায় এ্যান্টি ন্যারেটিভ গল্প। একটা গল্প বলে সেটাকে আবার ভেঙ্গে দেয়া। এ ব্যাপারে আসলে আমি প্রভাবিত হয়েছি নাটকের ব্রেখট দিয়ে, ফিল্মের গদার দিয়ে। এই গল্পটা যখন লিখছি তখন এদের কাজ খুব দেখছি। তাছাড়া শুরু থেকেই আমার এ্যাক্সিপেরিমেন্টাল শিল্পসাহিত্যের প্রতি আগ্রহ ছিলো। এমনকি গানের ক্ষেত্রেও আমি সেই আশির দশকের গোড়াতেই মহিনের ঘোড়াগুলি ব্যান্ডের ভক্ত হয়ে উঠেছিলাম। তারা এখন আলোচিত হচ্ছে কিন্ত বাংলা গানে ঐ ধরনের এক্সপেরিমেন্টের তারাই পাইওনিয়ার। তো এভাবেই নানা মাধ্যমের এক্সপেরিমেন্টের প্রভাব আমার উপর পড়েছে যার ফলে আমার গল্পগুলো অমন হয়েছে। আমি এরকম গল্প লিখব এমন সচেতন কোন পরিকল্পনা ছিলো না। এই যে নানা শিল্প মাধ্যমের ভেতর চলাফেরা করেছি সেটা আমার আত্ম নির্মাণে ভুমিকা রেখেছে মনে করি।
মাসউদুল হক : সচেতনভাবে না হলেও অবচেতনভাবে এই প্রস্তুতিপর্ব আপনার লেখায় হয়তো প্রভাব ফেলেছে। কিন্তু এক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জিং বিষয় হচ্ছে যে, আপনি যে ফরম্যাটে এ কথা বলতে চাইছেন সেটা আসলে শেষ পর্যন্ত পাঠকের কাছে পৌঁছুবে কি, সেটা কি আপনার ভাবনার বিষয় ছিল না?
শাহাদুজ্জামান : পাঠকপ্রিয় হওয়া, জনপ্রিয় হওয়া এসব আমার ভাবনার মধ্যে একেবারে কখনোই ছিলো না। বরং পাঠকপ্রিয় না কিন্তু মেধাবী, যারা আমার পাঠের অভ্যাসকে আঘাত করে এমন লেখকদের ব্যাপারে আমি আগ্রহ হয়েছি। যেমন কমলকুমার মজুমদার একসময় আমাকে আকর্ষণ করেছিলো। তিনি নিজের জন্য একধরনের সান্ধ্য ভাষা তৈরী করে নিয়েছিলেন। আমি নিজে কোনদিন এধরনের ভাষায় লিখব সেটা কোনদিন চিন্তা করিনি কিন্ত তার সাহসটাকে এনজয় করতাম। তিনি একবার বলেছেন ভাষাকে যে আঘাত করে সে ভাষাকে বাঁচায়। আসলে জনপ্রিয় হওয়া, পাঠকপ্রিয় হওয়া এসবের চাইতেও লেখার পুরো প্রক্রিয়াটা, জগতটা অনেক বড় ব্যাপার, ইন্টারেষ্টিং ব্যাপার। আবার ‘আমি জনপ্রিয় ধারায় লিখি না’ সেটা প্রমাণ করতে জোর জবরদস্তি করে ভাষার ইঞ্জিনিয়ারিং করে লেখাকে দুর্বোধ্য করে এক ধরনের ইন্টেলেকচুয়ালপনা করার প্রবণতাও আছে। আমি সেটার ব্যাপারেও সতর্ক থেকেছি। জনপ্রিয়তা কোন দোষের ব্যাপার না। একাধারে মেধাবী এবং জনপ্রিয় এমন লেখক পৃথিবীতে আছে। আসলে নিজের কথাটা সৎভাবে, সত্যিকার ভাবে বলতে যে ভাষা, যে আঙ্গিক দরকার সেটা ব্যবহার করলে সেটা পাঠকের কাছে কোন না কোনভাবে পৌঁছায় আমি সেটাই বিশ্বাস করি।  যখন লিখতে শুরু করেছি তখন এ লেখা কয়জন পড়বে সেটা ভাবিনি। মনে হয়েছে এটা লেখা দরকার তাই লিখেছি। আগেই বলেছি আমি বহুদিন শুধু লিটল ম্যাগাজিনে লিখেছি। বড় পত্রিকায় লিখিনি। তখন তো পত্রিকা অফিসে গিয়ে সম্পাদকের সাথে দেখা করা, নানা রকম সাহিত্যিক গোষ্ঠী করা এসব খুব ছিলো, এখনও আছে। সাহিত্য জগতে নানা গুরু শিষ্যের ব্যাপার থাকে, ওগুলোর মধ্যে আমি ছিলাম না কখনো।  লেখা ছিলো আমার একেবারে নিজের সঙ্গে নিজের মোকাবেলার একটা জায়গা। বড় পত্রিকায় আমি একসময় যখন লেখা পাঠাই সেটাও পাঠিয়েছি পোষ্ট করে। পত্রিকার কাউকেই চিনতাম না। আমার প্রথম দিকের গল্পগুলো ছাপা হয়েছে সংবাদে, ভোরের কাগজে, সাহিত্যপত্রে। এইসব পত্রিকার সম্পাদক কাউকে তখন চিনতাম না।  আমার লেখা ছাপানোর অনেক পরে তাদের সাথে পরিচয় হয়। যেটা বলতে চাচ্ছি যে লেখক হিসেবে বহু লোকের কাছে পরিচিত হওয়া, নাম ডাক হওয়া এসবের ইন্সপিরিশনে আসলে আমি লিখিনি। আমি স্কুল, কলেজের ম্যাগাজিন এসবে কখনো লিখিনি। আমার একেবারে প্রথম লেখা ছাপা হবার কথাটা বলি। আমি তখন চিটগাং মেডিকেলের ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্র, কিন্তু গান, নাটক, ফিল্ম এসব নিয়ে থাকি। সেখানে আমার এক সিনিয়ার বন্ধু আছেন মিলন চৌধুরী , নাটকের মানুষ। তার এক ধনবান ব্যাবসায়ী সাহিত্যপ্রেমিক বন্ধু ছিলেন, উনি তাকে বললেন একটা লিটল ম্যাগাজিন ফাইন্যান্স করতে। আর আমাকে বললেন, আপনি তো নানা বিষয়ে অনেক পড়াশোনা করেন, এসব নিয়ে লেখেন। তো তার চাপাচাপিতেই আমি প্রথম অনুবাদ করতে শুরু করি। সেটা ছাপা হয় ‘চর্যা‘ নামের সেই লিটল ম্যাগাজিনে। বেশ কয়েকটা সংখ্যা বেরিয়েছিলো সেই পত্রিকাটার, সেখানে নিয়মিত লিখেছি। পরে ‘প্রসঙ্গ‘ নামে আমরা ক’জন মিলে নিজেরাই নতুন ধরেন মাল্টিডিসিপ্লিনারী একটা পত্রিকা করি। সেসময় এধরনের পত্রিকা ছিলো না যেখানে সাহিত্য, ফিল্ম, নাটক, পেইন্টিং এসবের একটা কমপারেটিভ আলোচনা হতো।  ‘প্রসঙ্গ‘ সেই দিক থেকে ছিলো ব্যাতিক্রমী একটা পত্রিকা। আমি অন্যের মুখাপেক্ষি হয়ে লিখিনি। নিজের উপর বিশ্বাস রেখেছি। গৌতম বুদ্ধের সেই কথাটা যে ‘নিজে নিজের প্রদীপ হও’, আমার পছন্দের কথা। এটা আমার বিশ্বাস যে, কেউ যদি নিজের প্রতি সৎ থাকে তবে সেই সততা কোথাও না কোথাও গিয়ে  স্পর্শ করে। তুমি যে জানতে চাইলে লেখা পাঠকের কাছে পৌঁছাবে কিনা সেটা আমার কাছে কোন চ্যালেঞ্জ ছিলো কিনা। না আমি এটা নিয়ে বিশেষ চিন্তিত ছিলাম না। শুরু থেকেই আমার এমন একটা ভাবনা ছিলো যে পাঠকের রুচিকে শুধু ফলো করলে হবে না, গাইডও করতে হবে।
মাসউদুল হক : আপনার মধ্যে কিন্তু কবি-সত্তা প্রবল।  ’কাঁঠালপাতা ও একটি মাটির ঢেলার গল্প’ এই গল্পের লাইনগুলি যদি একটার পর একটা সাজানো যায় তবে ভাল একটা কবিতা পেয়ে যাই। আপনি কি কবিতা লিখতেন বা লিখেন?
শাহাদুজ্জামান :  না কবিতা আমি সেভাবে লিখিনি কখনো। হ্যাঁ, ক্লাস নাইন টেন থাকতে একটু চেষ্টা করেছিলাম, তারপর আর কখনো লিখিনি। কিন্তু কবিতার আমি একেবারে পেটুক পাঠক। বাংলা সাহিত্যের মোটামুটি সব ধারার কবিতা আমি পড়ার চেষ্টা করেছি। এখনও নিয়মিত কবিতা পড়ি। এই গল্পটা আসলে একটা কবিতা দিয়ে অনুপ্রাণিত হয়েই লেখা।
মাসউদুল হক : এই জন্য আমি বলছি যে, আমি খুব ক্রিটিক্যালি আপনার লেখার যে পরিবর্তনগুলো তা নব্বুইয়ের দশকের প্রথম থেকে মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করছি। আচ্ছা ইংরেজিতেও তো আপনার একটা বই বেরিয়েছে ইউপিএল থেকে।
শাহাদুজ্জামান: হ্যাঁ, সোনিয়া আমিন আমার কয়েকটা সিলেক্টেড গল্প অনুবাদ করছেন যেটা ইউপিএল থেকে বের হয়েছে,  ‘ইব্রাহিম বক্সের সার্কাস অ্যান্ড আদার স্টোরিজ‘ নামে।
মাসউদুল হক : আমার একটা অবজারভেশন হচ্ছে, রোমান্টিকতা মানুষের জীবনে সবসময় এগজিস্ট করে। তরুণ বয়সে আরো বেশি এগজিস্ট করে। কিন্তু বর্তমানের কথা বাদ দিলাম, আপনি যৌবনে যে লেখাগুলো লিখছেন সেগুলোতেও সে-ই অর্থে রোমান্টিকতার এগজিস্টেন্স কম। আপনাকে তরুণ বয়স থেকেই চরম বাস্তববাদি  বা মেনটালি খুব ম্যাচিউরড  মনে হয়েছে।  সমবয়সীদের সাথে কি ছোট বেলা থেকে আপনার একধরনের কমিউনিকেশন গ্যাপ ছিল?
মাসউদুল হক : রোমান্টিকতা বলতে তুমি সম্ভবত প্রেমের ব্যাপার বোঝাচ্ছ। তথাকথিত প্রেমের গল্প আমি লিখিনি সেটা ঠিক। তবে আমার ‘আন্না কারেনিনার জনৈকা পাঠিকা‘ কিম্বা ‘জোৎ¯œালোকে সংবাদ‘ এগুলো তো গভীর অর্থে প্রেমের গল্প, রোমান্টিক গল্প। তবে হ্যাঁ প্রেম বিষয়ে লেখালেখি করার ব্যাপারে একটু সতর্ক থেকেছি। সতর্ক না হলে এসব বিষয়ে লেখা খুব সেন্টিমেন্টাল ধাঁচের হয়ে উঠে। তাছাড়া তারুণ্যে দেখতাম, যারা নতুন লিখতে চাচ্ছে তাদের অধিকাংশের লেখার বিষয় প্রেম। এসব আমার কাছে খুব ছেলেমানুষী মনে হতো, ফলে খানিকটা সচেতনভাবেই ঐ প্রসঙ্গটাকে এড়িয়ে গেছি। এটা ঠিক যে এক বয়সে যখন আমার অনেক বন্ধুদের ধ্যান, জ্ঞান, সাধনা হচ্ছে প্রেমে পড়া আমি তখন রাজনীতি, দর্শন, সাহিত্য এসব নিয়ে ব্যস্ত, ফলে সমসাময়িকদের সাথে আমার একটা কমিউনিকেশন গ্যাপ ছিলো কথাটা সত্যি। আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সংখ্যা খুবই কম। আমি চরম বাস্তববাদী তা ঠিক না, আমি খুবই আবেগপ্রবণ, আমি প্রেমও করেছি কিন্তু বলতে পারো আবেগের চাইতে মনন আমাকে গাইড করে বেশী।
মাসউদুল হক : আপনি যে কোন জিনিস যখন দেখেন তখন আসলে শুধু ঐ ঘটনাটাই দেখেন না একটা বড় পারসপেকটিভ নিয়ে দেখেন। ধরুন যে, কাঁঠালপাতা ও মাটির ঢেলা গল্পে আপনি কিন্তু রূপবান এর কাহিনীকে ব্যবহার করতে যেয়ে শুধু রূপবানকে দেখছেন না সাথে শ্বাপদ সংকুল অরণ্যে এক শিশু কোলে নিয়ে পুরান কথার এক বালিকা যে একটা বনের মধ্যে হেঁটে যাচ্ছে- তার ভীত-সন্ত্রস্ত মুখচ্ছবিও অনুভব করছেন। এ ধরনের প্রসারিত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আপনি ফিল্ম  তৈরি করতে পারতেন।  কিন্তু সে জায়গায়ও পরে আর কাজ কনেননি।
শাহাদুজ্জামান : আমার ভাবনা, প্রস্তুতি এগুলোর ভেতর এতটা মাল্টিডিসিপ্লিনারী ব্যাপার আছে। আমার একটা বইয়ে আমি বলেছি যে  আলবেরুনীর একটা কথা আমার পছন্দ, উনি বলেছিলেন আমি দীর্ঘ জীবন চাই না, বিস্তৃত জীবন চাই। এই বিস্তৃত জীবনের লোভেই আমি নানা ডিসিপ্লিনে চলাচল করেছি, বিভিন্ন আর্ট মিডিয়া, দর্শন, রাজনীতি ইত্যাদি আমাকে আকর্ষণ করেছে। লোকসাহিত্য আমার ব্যাপক আগ্রহের বিষয়, ফলে যখন লিখি তখন এইসব নানা ডিসিপ্লিনের ভাবনাকে লিঙ্ক করার চেষ্টা করি। কাঁঠাল পাতার গল্পটা ছাড়াও আমার অনেক গল্পেও এমন নানা ভাবনার কানেকটিভি তুমি দেখতে পাবে। ফিল্মে কাজ করার ক্ষেত্রে এধরনের দৃষ্টিভঙ্গী একটা বাড়তি সুবিধা হয়তো হতো। তোমাকে আগেই বলেছি ফিল্মে কাজ করার ব্যাপারটাকে আমি একসময় খুব সিরিয়াসলি নিয়েছিলাম। ফিল্ম আর্কাইভে কোর্স করেছিলাম, ১৬ মিলিমিটিারে একটা শর্ট ফিল্মের শুটিংও করেছিলাম, এমনকি একসময় মস্কো ফিল্ম ইন্সটিউটে ভর্তি হবার সব ব্যবস্থা করে ফেলেছিলাম। তবে ফিল্মে ক্যারিয়ার করার জন্য বাংলাদেশের যে ধরনের চ্যালেঞ্জগুলোর মুখোমুখি হতে হয় সেটা আমার পক্ষে মোকাবেলা করা সম্ভব হবে না টের পেয়েছি, ফলে ফিল্মি অভিযাত্রা বেশীদূর অগ্রসর হয়নি। তবে ফিল্ম নিয়ে বরবার লেখাপত্র করেছি, এনিয়ে আমার বইও আছে ‘চলচ্চিত্র, বায়োস্কোপ প্রভৃতি’ নামে।
মাসউদুল হক : আপনার বাবা উচ্চ পদস্থ সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। আপনি ৭০ এর দশকে ক্যাডেট কলেজের মতো জায়গায় পড়াশোনা করেছেন। পরে পড়াশোনা করেছেন মেডিক্যাল কলেজ-এ। আপনি আজন্ম শহরে ছিলেন। গ্রামে হয়তো  গিয়েছেন তবে তা বেড়ানোর উদ্দেশ্যে। সে অর্থে কি আপনাকে আরবান লেখক বলা যায় না?
শাহাদুজ্জামান : ঠিক গ্রামে আমি বড় হয়নি কিন্তু সেই অর্থে বড় কোন শহরেও বড় হইনি। আমার বাবা ছিলেন ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, তার বদলীর চাকরী ছিলো দেশের নানা পাওয়ার ষ্টেশনে। সেসব পাওয়ার ষ্টেশনগুলো  তো ছিলো বলতে গেলে প্রত্যন্ত এলাকায়। আমার শৈশব কৈশরের একটা বড় সময় কেটেছে সিলেটের শাহজীবাজার নামের একটা জায়গায় যেখানে একটা গ্যাস পাওয়ার ষ্টেশন আছে। ওটা তো রীতিমত জলা জঙ্গলার একটা জায়গা, ওখানে গ্যাস আবিষ্কার হওয়াতে সেখানে পাওয়ার ষ্টেশনটা হয়েছিলো। ওখানে ছিলো একটা প্রাচীন মাজার আর একটা ছোট গ্রাম। এই সময়ের স্মৃতি নিয়ে আমার একটা গল্প আছে ‘মাজার, টেবিল টেনিস, আসলি মোরগ’ নামে। এছাড়া কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা, ঢাকার কাছে সিদ্ধিরগঞ্জ, খুলনার খালিশপুর এসব জায়গার পাওয়ার ষ্টেশনের ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন আমার বাবা, সেসব জায়গায় থেকেছি আমি। তবে সেসব জায়গায় থাকলেও এইসব ছোট ছোট শহরের মূল জীবনযাত্রার সাথে আমাদের যোগাযোগ ছিলো না। আমরা থাকতাম ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য নির্দিষ্ট এলাকায় সরকারী কোয়ার্টারে , নানা সরকারী সুযোগ সুবিধা ভেতর। ইঞ্জিনিয়ারদের নিজম্ব একটা জগত ছিলো যেটা স্থানীয় জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন, একটা এলিট জীবন বলা যায়। এরপর আমি তো ক্যাডেট কলেজে চলে গেলাম, সেটাও একটা নির্দিষ্ট গন্ডির জীবন।  ফলে আমি ঠিক শহরে বড় হইনি বরং বলা যায়  গ্রামে বা মফস্বলে থেকেও এক ধরনের আরবান লাইফ ষ্টাইলে বড় হয়েছি। তবে আমি সত্যিকার অর্থে গ্রামে যাই পড়াশোনা শেষে ব্রাকের স্বাস্থ্য প্রকল্পের ডাক্তার হিসেবে । আমি বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার প্রত্যন্ত গ্রামে কাজের সূত্রে থেকেছি। এটা গ্রামে বেড়াতে যাওয়া না, দিনের পর দিন, মাসের পর মাস থাকা। সেটা আমার জন্য ছিলো অসাধারণ অভিজ্ঞতা। গ্রামে থাকার সেই অভিজ্ঞতা আমার জীবনকে দেখার চোখ বদলে দিয়েছে। মধ্যবিত্ত জীবনের গন্ডি, বইপত্র আর অক্ষরকেন্দ্রিক জীবনের গন্ডি পেরিয়ে একটা নতুন জগতের অভিজ্ঞতা হয়েছে আমার। গ্রামের অভিজ্ঞতা আমার লেখার উপরও অনেক প্রভাব ফেলেছে। গ্রাম জীবনের সংগ্রাম আর ঐশ্বর্য খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। আমাদের গ্রামগুলো তো একটু একটু করে বদলে যাচ্ছে প্রতিদিন। তারপরও লোক সংস্কৃতির নানা মাত্রার সাথে সরাসরি পরিচয় হয়েছে আমার তখন। রাত জেগে পালা শুনেছি, যাত্রা দেখেছি। আমার খুব পছন্দের কাজ ছিলো হাটের দিনে নানা ঔষধের ক্যানভাসারদের বক্তৃতা শোনা। আমি তাদের গল্প বলার ক্ষমতায় মুগ্ধ থাকতাম। এসব অভিজ্ঞতা আমার লেখাকেও প্রভাবিত করেছে। ফলে আমাকে ঠিক আরবান লেখক কেন বলা হবে জানি না।
মাসউদুল হক : আপনি কি কোন ডায়েরী বা নোটবুক ব্যবহার করেন?
শাহাদুজ্জামান : হ্যাঁ। আমার নোটবুক থাকে যেখানে আমি নানা কথা , ভাবনা লিখে রাখি।
মাসউদুল হক : এটা কি স্বাভাবিক আগ্রহ বা অভ্যাস থেকে নাকি-কখনো গল্প লেখার ক্ষেত্রে কাজে লাগবে ভেবে কোন গান, কবিতা বা বিখ্যাত কোন লোকের উদ্ধৃতি লিখে রাখেন?
শাহাদুজ্জামান : হ্যাঁ এগুলো আমার লেখায় কাজে লাগবে সেকথা ভেবেই নোট রাখি। কোথাও কোন একটা কথা শুনলাম বা ঘটনা দেখলাম সেটা সংক্ষেপে লিখে রাখি এবং পরে সেটাকে কোন গল্পে বা নিবন্ধে এক্সপান্ড করি। অনেক সময় অন্যের কোন লেখার চমৎকার কোন অংশ লিখে রাখি। আমার নিজের কোন লেখায় সেটা উল্লেখ করে ঐ লেখাটাকে আবার নতুন জীবন দেই। একটা ভালো সৃষ্টিকে সার্কুলেট করি।
মাসউদুল হক : আমি এখন লিডিং প্রশ্নে চলে আসি। অনুবাদ সাক্ষাৎকার এই কাজগুলো কি যখন আপনার রাইটার্স ব্লক কাজ করে তখন বেশি করেন?
শাহাদুজ্জামান : অনুবাদ, সাক্ষাৎকার যখন শুরু করেছিলাম তখন নিজের মৌলিক লেখার কোন তাগাদা ছিলো না। পরে যখন নিজের লেখার পরিমান বাড়তে লাগলো তখন সত্যি বলতে কি, নিজের লেখার গ্যাপে খানিকটা দম নিতে অনুবাদ ইত্যাদি করেছি।
মাসউদুল হক : ক্যাঙ্গারু দেখার শ্রেষ্ঠ দিন- গল্প সংকলন বাংলা সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য একটি অনুবাদ গল্প সংকলন। এই গুরুত্বপূর্ণ কাজে হাত দেয়ার পেছনে কি আপনার মধ্যে রাইটার্স ব্লক কাজ করছিল?
শাহাদুজ্জামান : হ্যাঁ, বলতে পারো সে সময় এক ধরনের রাইটার্স ব্লক চলছিলো আমার। তার কিছু আগে ক্রাচের কর্নেলের মত গবেষণাধর্মী বড় একটা কাজ শেষ করেছি। নতুন কোন গল্প লেখাও হয়ে উঠছিলো না। কিন্তু কিছু লিখতে ইচ্ছা হচ্ছিল। তখন অনুবাদে হাত দেই। 
মাসউদুল হক :  আপনার আরেকটি উল্লেখযোগ্য গল্প ’মহাশূন্যে সাইকেল’।  ক্যাঙ্গারু দেখার শ্রেষ্ঠ দিন Ñ গ্রন্থটি অনুবাদের পর আপনার লেখার ধরনে পরিবর্তন এসেছে বলে আমার মনে হয়েছে। সম্ভবত ’মহাশূন্যে সাইকেল’ সেই পরিবর্তনের ইংগিত দেয়। ঐ গল্পগুলো নিয়ে পরে আপনার সাথে কথা বলবো। তবে পরিবর্তনটা কি এমন যে আপনি একটা সময় হয়ত নিজের সাথে নিজে বোঝাপড়া করলেন। তারপর আবার শুরু করলেন। যেমন আমরা দেখি, আপনার প্রথম জীবনের গল্পগুলো দৈর্ঘ্য ছোট ছিল পরে দেখা যাচ্ছে যে, দৈর্ঘ্য বড় হচ্ছে। গল্পের দৈর্ঘ্যরে বিষয়ে পাঠকের একটি সমালোচনা ছিল। পাঠকের এই সমালোচনাকে রেসপন্স করছেন কি?
শাহাদুজ্জামান : এটা তোমার ভালো পর্যবেক্ষণ। আমি ক্যাঙ্গারু দেখার শ্রেষ্ঠ দিনের গল্পগুলো অনুবাদ করেছি প্রবাসে বসে, সে বছর আমি ইউকেতে গেছি নিউক্যাসেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরী নিয়ে। আমার জীবনযাপনে একটা পরিবর্তন এসেছে। মহাশূন্যে সাইকেল গল্পটাতে দূরত্বের বোধ প্রসঙ্গটা এসেছে ঘুরে ফিরে। বলতে পারো বিদেশে যাওয়ার পর নিজের সঙ্গে বোঝাপড়ার একটা নতুন মাত্রা তৈরী হয়েছে। এসবের একটা প্রভাব গল্পেও পড়েছে। সুতরাং তুমি ঠিকই বলেছ, ক্যাঙ্গারু দেখার বইটার পর আমার লেখায় এক ধরনের পরিবর্তন এসেছে। তবে গল্পের দৈর্ঘ্য যে পাঠকের সমালোচনার ভিত্তিতে বেড়েছে তা না। আমি কখনই এমন ভেবে গল্প লিখিনি যে এটা দু পৃষ্ঠা বা তিন পৃষ্ঠার গল্প হবে। আমার বলার কথাটা বলে ফেলবার জন্য যতটুকু পরিসর দরকার আমি ততটুকুই দিয়েছি। দু পৃষ্ঠায় আমার মুল কথাটা বলা হয়ে গেলে শুধু পৃষ্ঠা বাড়াবার জন্য সেটাকে আর দীর্ঘ করিনি। তবে তুমি যেমন বললে পরবর্তীকালে আমার বলার কথাগুলোর ধরন পাল্টেছে ফলে তার জন্য হয়তো গল্পগুলোও দীর্ঘ হয়ে গেছে।
মাসউদুল হক : অন্যান্য লেখকের সাথে আপনার পার্থক্য অনেক আছে। তবে দেখা যায়, আপনার লেখায় পরকীয়া প্রেম, যৌনতা Ñ এই বিষয়গুলো তেমন প্রকট না। এগুলোকে আপনি সচেতনভাবেই কি এড়িয়ে যান, না লিখতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না।
শাহাদুজ্জামান : পরকীয়া প্রেম, যৌনতা এগুলো তো জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আগেই বলেছি এসব নিয়ে লিখতে সতর্ক থাকি। কারণ এসব বিষয়ের প্রচুর অপব্যবহার দেখেছি সাহিত্যে। বাজারমুখী হালকা আনন্দের বিষয় হতে দেখেছি। আমার লেখায় প্রকটভাবে এসব নিশ্চয়ই নাই কিন্তু সূক্ষ্মভাবে আছে। ‘ক্যালাইডোস্কোপ‘ গল্পটায়, ‘বিসর্গতে দুঃখ’তে পরোক্ষভাবে আছে। সেই যে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের একটা লাইন আছে না, ‘ফুলকে সরিয়ে নাও, একে দিয়ে অনেক মিথ্যা বলানো হয়।’  আমার লেখায় এসব বিষয়কে একটু সরিয়ে জীবনের অন্য দিগন্তগুলোর উপর একটু বেশী জোর দিয়েছি বলতে পারো।
মাসউদুল হক :   ’সেল্ফ সেন্সরশীপ’ সাহিত্যের একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। লেখক হিসেবে আপনি কোন কোন বিষয়ে সেলফ সেন্সরশীপ’ আরোপ করেন?
শাহাদুজ্জামান : হ্যাঁ, সেল্ফ সেন্সরশীপ‘ একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। আমি কি নিয়ে লিখব সেটা যেমন ঠিক করা দরকার তেমনি কি নিয়ে লিখব না সেটার ব্যাপারেও সিদ্ধান্ত নেয়া দরকার। আমি তা করি। 
মাসউদুল হক : আপনার কি লেখার সময় মনে হয় না যে এটা আপনার ফ্যামিলি মেম্বার পড়বে?
শাহাদুজ্জামান : আমার ফ্যামিলি মেম্বাররা আমার লেখাপত্র পড়ে। আমার বাবা, মা সাহিত্য অনুরাগী, আমার ভাই বোনরাও, অন্যান্য আত্মীয় স্বজনরা আমার লেখা পড়ে। তাদের কথা ভেবে আমি মোটা দাগে কোন কিছু সেন্সর করি না। তবে এ কথা সত্য যে মনের গভীরতর সব কথা অকপটে এখনও বলে উঠতে পারি না, সেখানে সেল্ফ সেন্সরশীপ চলে আসে।  অনেক কথা হয়তো চেপে যাই কারণ তাতে হয়তো আমার একেবারে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কগুলো এফেক্টেড হবে। 
মাসউদুল হক :  আমার মনে হয় যৌবন চলে যাবার পর মানুষ অনেক প্রাণবন্ত হয়ে উঠে।  যৌনতা, ধর্ম, পরকীয়া, অনাচার ইত্যাদি নিয়ে অনেক বেশি কথা বলতে পারে। যৌবন থাকাকালে সেল্ফসেন্সরশীপ বেশি মাত্রায় আরোপ হয়।
শাহাদুজ্জামান : একটু বয়স হলে যৌনতা, ধর্ম, পরকীয়া, অনাচার ইত্যাদি নিয়ে একটু থিতু হয়ে ভাবার সুযোগ হয়, সেটা ঠিক। অল্প বয়সে অনেক সময়ে উত্তেজনার বশে অনেক বেশী কথা বলা হয়ে যায়। আমার বয়সও বেড়েছে ফলে এসব ব্যাপার নিয়ে আরো গভীরভাবে ভাবার সুযোগ হচ্ছে।
মাসউদুল হক :  আপনার প্রায় সব গল্পেই নায়কের সাথে নায়িকার সরাসরি উপস্থিতি নেই। ধরেন যে, গল্প বা উপন্যাসের নারী চরিত্র- সে মূল চরিত্রের স্ত্রী অথবা গল্পের মূল চরিত্রের সাথে গাড়িতে পাশে বসে থাকা কোন এক যাত্রী। অথবা হয়তো মূল চরিত্রের সাথে নারীটির বাস ষ্টপেজে দেখা হচ্ছে। শুধু একটি গল্পে আমরা দেখি নিতি নামের একটি চরিত্রের সাথে আপনার সম্পর্ক আছে কিন্তু এই কথাটি আপনি উল্লেখ করেছেন ব্র্যাকেটের মধ্যে।  এমনকি আমার খুব প্রিয় একটা গল্প ’জোৎ¯œালোকের সংবাদ’-এ রিজিয়া গল্পের প্রয়োজনে একটা সাবজেক্ট। গল্পের গতিপথ নির্ধারণে তার কোন গুরুত্ব নেই। গল্পের নারী চরিত্রের ব্যবহার খুবই কম। এটার পেছনে কি কোন সচেতন বা অসচেতন কার্যকারণ ক্রিয়াশীল?
শাহাদুজ্জামান : এটা একটা ইন্টারেষ্টিং কথা বলেছ তুমি। সত্যিই কি আমার নায়ক নায়িকার সরাসরি দেখা হয় না? আমি নিজেও তো সেটা খেয়াল করিনি। ব্যাপারটা তো আমাকেও ভেবে দেখতে হবে। তবে গল্পে গতিপথ নির্ধারণে নারী চরিত্রের ভুমিকা নাই সেটা বোধহয় ঠিক না। তুমি নিতিকে নিয়ে যে গল্পটার কথা উল্লেখ করেছ সম্ভবত চীনা অক্ষর.. গল্পটা,  সেখানে ছেলেটার সব কর্মকাণ্ড তো মূলত নিতি নামের মেয়েটাকে দিয়েই নির্ধারিত। কিম্বা আন্না কারেনিনার জনৈকা পাঠিকা গল্পে সেই পাঠিকা তো গল্পের কেন্দ্রে আছে।
মাসউদুল হক :  এটা ব্যক্তিগত জীবন যাপনের বিষয় নিয়ে কথা বলি। আপনার কথাসাহিত্য আমাদের ধারণা দেয় যে আপনার একটা গড গিফটেড প্রবল ও গভীর পর্যবেক্ষণ শক্তি রয়েছে। বস্তুত এই প্রবল ও গভীর পর্যবেক্ষণ শক্তি, যেটা আসলে আপনাকে অন্যান্য সমকালীন লেখকদের চেয়ে আলাদা করে আলোচনার সুযোগ করে দেয়। এরকম একটা শক্তি নিয়ে স্বাভাবিক জীবন যাপন করা কি বিব্রতকর মনে হয় না?
শাহাদুজ্জামান : ভালো প্রশ্ন করেছ। এটা ঠিক যে যতক্ষণ জেগে থাকি চারিদিকে জীবনটাকে পর্যবেক্ষণ করতে থাকি অবিরাম। কথা সত্য যে খুব কাছের মানুষজনও যখন পর্যবেক্ষণের বিষয় হয়ে উঠে তখন অনেক সময় ব্যাপারটা বিব্রতকর, অস্বস্তিকর হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু এ থেকে তো আমার নিস্তার নাই। যখন যা দেখছি, যার সাথে কথা বলছি সেসবকে নানা মাত্রায় পর্যবেক্ষণের আওতায় রাখা আমার একেবারে স্বভাবের ভেতর ঢুকে গেছে। তাছাড়া আমি এ্যানথ্রপলজি পড়েছি, এ্যানথ্রপলজির একটা বড় ব্যাপার হচ্ছে পর্যবেক্ষণ। কিভাবে সিসটেম্যাটিক অবজারভেশন করতে হয় তার ম্যাথডলজি আমি পড়েছি। ফলে এটা আমার পেশাগত কাজও বলতে পারো। এই পর্যবেক্ষণ প্রবণতা আমার লেখালেখি এবং নৃবিজ্ঞান গবেষণা দুক্ষেত্রেই কাজে লাগে।
মাসউদুল হক : কিন্তু আবার শেষ পর্যন্ত আপনি কিন্তু ভেরি মাচ অর্গানাইজড?
শাহাদুজ্জামানঃ আসলে আমি দুটো একেবারে প্যারালাল জীবন যাপন করি বলতে পারো। একটা আমার পেশাগত জীবন, যেটা শিক্ষকতা, গবেষণা আরেকটা আমার লেখক জীবন। দুটাই খুব ডিমান্ডিং। আমি বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করি, বিশ্বস্বাস্থ্য নিয়ে গবেষণা করি, এগুলো খুবই পরিশ্রম সাধ্য, সময় সাপেক্ষ কাজ। এরপর আমি যে ধরনের লেখা লিখি সেগুলো অনেক সময় দাবী করে। এর  বাইরে সংসার, স্ত্রী, পুত্র এদের নিয়েও তো নানা দায়িত্ব রয়েছে। ফলে আমাকে অর্গানাইজড হতে হয়, তা না হলে এতগুলো জীবন সামলানো অসম্ভব। আমি না লেখালেখি করলে হয়তো আরো ভালো স্বামী বা বাবা হতাম, আরো ভালো একাডেমিক হতাম। কিন্তু লেখার নেশা আমি ছাড়তে চাইনি ফলে ধীরে ধীরে এই অর্গানাইজড হওয়াটাকে রপ্ত করতে হয়েছে। আমি আমার লেখার কাজগুলো করি রাতে, প্রতি রাতেই লিখতে বসি।  প্রবাসে থাকলে একটা সুবিধা অবশ্য আছে যে, যেহেতু চেনা জানা মানুষ এখানে কম ফলে সোসালাইজেশনে বেশী সময় দিতে হয় না। 
মাসউদুল হক : তাহলে কি আমি বলতে পারি, আপনি বাজারে যান, মাছ কেনেন, বউয়ের রাগ ভাঙ্গান, সবই করেন কিন্তু এগুলোর মধ্যে কোন উষ্ণতা থাকে না?
 শাহাদুজ্জামান : আমি বাজার ঘাট, মাছ কেনা সবই করি, বউয়ের রাগ ভাঙ্গাতেও চেষ্টা করি। আমার স্ত্রী পাপড়ীন নাহারের সাথে আমার ভালো সম্পর্ক। সে আমার প্রেমিকা ছিল। আমি তাকে আমার প্রথম বই উৎসর্গ করেছি। সে আমার গল্পের প্রথম পাঠক। তবে সংসারের বৈষয়িক ব্যাপারগুলো আমি খুব একটা সফলভাবে করতে পারি, তা না।  জীবনানন্দ যেমন বলেছিলেন যে ‘কারুবাসনা আমাকে নষ্ট করে দিয়েছে।’  
মাসউদুল হক :  আচ্ছা গল্প তো গল্পই। কিন্তু আপনি একটা বই প্রকাশ করলেন যেখানে গল্পগুলোকে  তিনভাবে ভাগ করলেন ‘গল্প, অগল্প এবং না-গল্প‘ এইভাবে। এই তিন শ্রেণি বিভাজন আপনি কেন করতে গেলেন? আপনার কি নিজেরও সংশয় ছিল? কিছু কিছু গল্প কি আদৌ গল্প কি-না?
শাহাদুজ্জামান : বলতে পারো তাই।  আমি সেই বইয়ের ভূমিকায় সে কথা বলেছি। আমার অনেক গল্পকেই প্রচলিত ধারার গল্প হয়তো বলা যাবে না। আমি বলেছি যে সাহিত্যের নানা শাখার ভেতরকার দেয়াল ভেঙ্গে ফেলতে আমি পছন্দ করি। আমার গল্পের ভেতর প্রবন্ধ বা কবিতার উপাদানও আছে। আমার কোন কোন গল্পকে কেউ বলেছেন ডকু ফিকশন, কেউ মেটাফিকশন। আমার একটা এ্যান্টি ন্যারেটিভ গল্পের নাম ‘অগল্প’, যেটার কথা আগে বলেছি। তো এসব মিলিয়েই আমি আমার গল্পগুলোকে কোন বিশেষ তকমায় ফেলতে চাইনি বলে এ ধরনের একটা নাম দিয়েছি। এ লেখাগুলোকে যে নামেই ডাকা হোক না কেন আমার আপত্তি নাই।
মাসউদুল হক : আপনার গল্প উপন্যাসের নায়করা সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার প্রতি দুর্বল। মূলতঃ আপনারও যে ঐ ব্যবস্থার প্রতি দুর্বলতা আছে সে-টা আপনি লুকান না। ’জ্যোৎ¯œালোকের সংবাদ’ গল্পটা উত্তম পুরুষে বর্ণনা করেছেন। গল্পের কথক গল্পের শেষে এসে তার ভাই মঞ্জুকেই নায়ক বানায়। যে কি-না সমাজতান্ত্রিক আদর্শের প্রতি দুর্বল।  দেখা যাচ্ছে যে, গল্পে আপনার যে হিরো বা  যারা হিরো তারা কোন না কোন ভাবে সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শের প্রতি দুর্বল ।
শাহাদুজ্জামান : আমি যখন লেখালেখি শুরু করি তখন রাজনৈতিক দর্শন হিসেবে আমি মার্ক্সবাদের অনুসারী ছিলাম। পৃথিবীব্যাপী যে ব্যাপক বৈষম্য সেটা নিরসনে মার্ক্সবাদী বিশ্ববীক্ষা একটা প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা দেয় বলেই আমি মনে করি। তবে সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব ভাঙ্গনের ভেতর দিয়ে অনেক  নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে। সেসব অভিজ্ঞতার আলোকে সমাজতান্ত্রিক দর্শনকে নতুন করে ভাবার আছে। একটা সাম্যবাদী সমাজের প্রতি আমার অবশ্যই দুর্বলতা আছে। তবে সেটা কিভাবে আসবে তা নিয়ে আরো গভীরভাবে ভাবার প্রয়োজন আছে। সমাজতান্ত্রিক আদর্শকে কিভাবে স্থানীয় সংস্কৃতির সাথে যুক্ত করা যায় সেসব নিয়ে ভাবার আছে। নিও মার্ক্সিজম, সাব অলটার্ন ভাবনা এক্ষেত্রে আমাদের নতুন চিন্তার খোরাক দেয়। পুরনো সোভিয়েত ধারার সমাজতন্ত্রে ফিরে যাবার সুযোগ নেই এখন আর।
মাসউদুল হক :  হ্যাঁ, আপনি তো সরে আসছেন সেই ভাবনা থেকে। কারন ’শিং মাছ, লালজেল...’ গল্পের মধ্যে আপনি নিজে নিজের সাথে কথা বলছেন , বললে অত্যুক্তি হবে না। হামিদের চোখ দিয়ে দুটি সত্তার বোঝাপড়ার কথা বলছেন।  আপনি নিজের সাথে বোঝাপড়া করছেন, এটা বুঝা যায়। কিন্তু ধরেন যে অনেক সময় তা ব্যক্তিপূজার মতো মনে হয়েছে। যেমন ধরেন, আপনার হিরো হচ্ছে কর্নেল তাহের, ফিদেল কাস্ট্রো। আপনি দেখা যাচ্ছে কর্নেল তাহের একটা আর্মি অফিসার হয়ে জিপে দাঁড়িয়ে গুলি করতে করতে বিয়ে বাড়িতে ঢুকছেন Ñ  তেমন একটা অসামরিক এবং উচ্ছৃঙ্খল বিষয়কেও আপনি অনেক বড় করে দেখাচ্ছেন। আজকের বিশ্ব প্রেক্ষপটতো বটেই বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও কেমন জানি বিসদৃশ লাগে এমন একটি ঘটনা। আজকের একজন আর্মি অফিসার গুলি করতে করতে বিয়ে বাড়িতে ঢুকবে এটি কি কেউ কল্পনাও করতে পারে? 
শাহাদুজ্জামান : এগুলোকে ব্যক্তিপুজা কেন বলবে জানি না। ব্যক্তি এককভাবে কিছু করে না কিন্তু কোন কোন ব্যক্তির ভেতর দিয়ে ইতিহাসের আকাক্সক্ষাগুলো পরিস্ফুট হয়ে ওঠে। ফলে ইতিহাসে ব্যক্তির তো বড় ভূমিকা আছে। আমি এসব ব্যাক্তিকে ঠিক ব্যক্তি হিসেবে তুলে ধরিনি বরং চেষ্টা করেছি কিভাবে এই ব্যক্তিরা তার দেশ কালের স্পিরিটটাকে ধারণ করেছে সেটা প্রকাশ করতে। কর্নেল তাহের ব্যক্তি হিসেবে তো ব্যর্থ, কারন তিনি যা করতে চেয়েছেন তার কিছুই করতে পারেননি কিন্তু। আমি তার স্পিরিটটাকে ধরতে চেয়েছি। তাহেরকে বুঝতে হলে তার সময়টাকে বুঝতে হবে। সেই সময়ের তারুণ্যের আকাক্সক্ষাগুলো কেমন সাহসের সাথে তিনি ধারণ করেছেন সেটা লক্ষ্য করতে হবে। বিয়ের আসরে গুলি করতে করতে ঢোকা ব্যাপারটা বিসদৃশ মনে হবে নিশ্চয়ই কিন্তু এর ভেতর একটা রোমান্টিকতা, এ্যাডভেঞ্চারপ্রিয়তা আছে। আজকের প্রেক্ষিতে এটাকে পাগলামি মনে হতে পারে কিন্তু সে সময়টার প্রেক্ষিতে সেটা দেখতে হবে। উনি পরবর্তী যে কাজগুলো করেছেন সেগুলো তো এক অর্থে সব  উচ্ছৃঙ্খলতা। কিন্তু তোমার মনে রাখতে হবে যে কোন বিপ্লব মাত্রই একধরনের উচ্ছৃঙ্খলতা। আজকের পৃথিবীর যে হিসাবী, বৈষয়িক প্রজন্ম তাদের দিকে তাকিয়ে সেই প্রজন্মের মানুষগুলো একটা কোন আদর্শের জন্য যেসব বেহিসাবী কাজগুলো করেছেন সেগুলোকে আমি সহানুভূতির সাথে দেখি। তাদের জীবনকে অনেক সিগনিফিকেন্ট মনে হয়।  
মাসউদুল হক :  প্রসংগক্রমে আরেকটি কথা বলি। আমি ক্রাচের কর্ণেল পড়িনি। তবে এ বইয়ের উপর আলোচনা এবং কর্ণেল তাহেরের জীবন ও রাজনীতির উপর কিছুটা ধারনা আছে। সেই প্রেক্ষাপটে জানতে চাইছি। যেহেতু কর্ণেল তাহের আর্মিতে ছিলেন। ১৮ বছর বয়সেই তিনি সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। তারপর আর্মি থেকে যখন বেরিয়ে আসেন তখন তার বয়স ৩০ ছিল। ঐ দীর্ঘ ১২ বছর ক্যান্টনমেন্টে থেকে একজন মানুষ কি সমাজতান্ত্রিক আদর্শে দীক্ষা নেয়ার কোন সুযোগ পান? নাকি সবই তার রোমান্টিসিজম?
শাহাদুজ্জামান :  তুমি আমার ক্রাচের কর্নেল বইটা ভালোভাবে পড়লে দেখবে তাহের আমিতে গেলেও কখনোই বৃহত্তর জনজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন না। তিনি একটা রাজনৈতিক মিশন নিয়েই আর্মিতে গিয়েছিলেন এবং সেখানে থেকেই নানা রাজনৈতিক তৎপরতা করেছেন। সেনাবাহিনীতে থাকলে সমাজতন্ত্রে দীক্ষা নেবার সুযোগ নাই একথা তো ঠিক না, সেনাবাহিনী থেকে বহু বিপ্লবীই পৃথিবীতে জন্ম নিয়েছেন। আর রোমান্টিক তো তিনি ছিলেনই। যে কোন বিপ্লবী মাত্রই রোমান্টিক। যেমন বলছিলাম আজকের দুনিয়ার শুধু আত্মপ্রতিষ্ঠা আর বৈষয়িক সাফল্যের হিসাব নিকাশে ব্যস্ত চালাক প্রজন্মের চাইতে ঐ রোমন্টিক ভুলভাল করা প্রজন্ম মানুষ হিসেবে অনেক প্রাণবন্ত আমার কাছে।
মাসউদুল হক :  কর্ণেল তাহেরের আচরণের মধ্য দিয়ে, সেই সময় সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে যে স্বেচ্ছাচারিতা ছিল সেটা কিন্তু প্রকাশিত। কারণ বাংলাদেশ এর সেনাবাহিনী পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর গর্ভে জন্ম হয়েছে। ওরা সাধারণত এগুলো পাকিস্তানের পেশোয়ার মুলতানে ৬০ বা সত্তুরের দশকে করে থাকতে পারে। আমার যেটা মনে হয় পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর কালচার হয়তো তার মধ্য দিয়ে প্রবেশ করেছিল?
শাহাদুজ্জামান :  আমার ক্রাচের কর্নেল বইটাকে একটু মনোযোগ দিয়ে পড়তে অনুরোধ করব। সেখানে দেখবে তাহেরের মিশনই ছিলো বাংলাদেশের সেনাবাহিনীকে পাকিস্তানী এবং কলোনিয়াল সেনাবাহিনীর প্রভাবমুক্ত করে পিপলস আর্মি তৈরী করা। তার ভেতর স্বেচ্ছাচারিতার কোন নমুনা আমি দেখিনি।   মাসউদুল হক : আপনার পারসেপশন অবশ্য গড়পড়তা লোকের চেয়ে আলাদা।  যেমন ’ইব্রাহিম বক্সের সার্কাস’ গল্পটির কথা বলা যায়। সেখানে গ্রামের হাঁটে পাঞ্জাবি বিক্রি করছে এক লোক। ইউজুয়ালি তো দেখা যায় যে গ্রামের মানুষ যেটা খুব টকটকে রংয়ের - সেটাই পছন্দ করে। আমরা এধরনের টকটকে রংয়ের জিনিসের প্রতি গ্রামের মানুষের আগ্রহকে গ্রাম্য-মানসিকতার পরিচয় বলে দেখি। সাধারণ বাংলায় বলি খ্যাত। কিন্তু আপনি তাদের ঐ টকটকে লাল-রংয়ের পাঞ্জাবী পছন্দ করাকে ব্যাখ্যা করতে যেয়ে বললেন, ’ঐরকম লাল টকটকে পাঞ্জাবী পরার মতো সারল্য আমার নেই।’ ঘটমান ঘটনাকে সবার চেয়ে আলাদাভাবে দেখা কি আপনার সহজাত। নাকি ভিন্ন কিছু ব্যাখ্যা করার জন্যই আপনি ঐভাবে নিজের চিন্তা শক্তিকে প্রভাবিত করেন?
শাহাদুজ্জামান : আউট অব দি বক্স ভাবতে আমি সবসময় পছন্দ করি। আরোপিতভাবে ভিন্ন কিছু ভাবার চেষ্টা করি না ।
মাসউদুল হক :  আপনি কখন অনুভব করলেন যে আপনি বাংলা সাহিত্যে একজন বিশিষ্ট লেখক?
শাহাদুজ্জামান : আমি বিশিষ্ট লেখক কিনা জানি না। একটা প্যাশন থেকে লেখালেখি করে যাই এবং টের পাই যে আমার একটা পাঠক পাঠিকা গোষ্ঠী আছে। নানাভাবে আমার লেখার রিয়াকশন পাই। অচেনা একজন মানুষকে শুধুমাত্র লেখার মধ্য দিয়ে স্পর্শ করতে পেরেছি সেটা দেখতে পাই। সেটা আমার কাছে গুরত্বপূর্ণ। আমি বিশিষ্ট না বিখ্যাত লেখক সেটা নিয়ে বিশেষ ভাবি না।
মাসউদুল হক :  ইদানিংকালে একটা আলোচনা হয় যে, দৈনিক পত্রিকা নিজে যেমন কোন বিষয় জনপ্রিয় করে আবার জনপ্রিয় বিষয়ের সাথে নিজেকে জড়াতে পছন্দ করে। যেহেতু আপনি তো ইদানিং দৈনিক পত্রিকা কেন্দ্রিক কিছু লেখালেখি করছেন। সে কারণে আমি জানতে চাইছি- আপনি কি দৈনিক পত্রিকার সাথে জড়ালেন না-কি দৈনিক পত্রিকা আপনার সাথে জড়ালো?
 শাহাদুজ্জামান : আসলে দৈনিক পত্রিকা আমাকে কলাম লেখার অনুরোধ জানায়। লিখব কিনা সেটা নিয়ে শুরুতে দ্বিধা ছিলো। কিন্তু পরে সচেতনভাবেই সিদ্ধান্ত নিই লেখার। কেন লিখছি সেটা নিয়ে কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর আমার একটা সাক্ষাৎকার নিয়েছিলো তাতে অনেক বিস্তারিত আলাপ করেছি। এইটুকু বলি আমি আমার দৃষ্টিভঙ্গীকে বজায় রেখে আমার টুকরো নানা ভাবনাকে বৃহত্তর একটা পাঠকের কাছে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। আমি প্রচলিত ধারার রাজনৈতিক কলাম লিখিনি।  আমি সমাজ, দর্শন, ভ্রমণ ইত্যাদি নিয়ে নানা ভাবনার কথা লিখেছি যেগুলো হয়তো আমি কখনো কোন গল্প বা প্রবন্ধে লিখব না। দৈনিক পত্রিকা না লেখক কে কাকে ব্যবহার করবে সেটা লেখকের উপর নির্ভর করবে। পত্রিকায় কলাম লেখা আমার লেখালেখিতে কিভাবে ইতিবাচক ভুমিকা রেখেছে সেটা নিয়ে বিস্তারিত আলাপ করেছি জাহাঙ্গীরের সঙ্গে। সেই সাক্ষাৎকার আমার নিজের বই ‘দূরগামী কথার ভেতর’ এবং জাহাঙ্গীরের সম্পাদিত সাক্ষাৎকার বইয়ে আছে।   মাসউদুল হক :  আপনি কি মনে করেন যে, লেখালেখি যদি আপনার পেশা হতো তাহলে আপনি এখন যেমন লিখছেন তার চেয়ে লেখার পরিমান বেশি হতো বা  মানের দিকটা আরো উন্নত হতো ?
শাহাদুজ্জামান : সেটা তো আগে তোমাকে বলেছি যে লেখাকে যদি আমি পেশা হিসেবে নিতে পারতাম তাহলে আমি সবচেয়ে খুশী হতাম। আমি নিশ্চয়ই আরো বেশী লিখতে পারতাম এবং মন খুলে লিখতে পারতাম। কিন্তু আমি যে ধারার লেখা লিখি তা দিয়ে তো এদেশে জীবিকা নির্বাহ করা সম্ভব না। তবে লেখার মানের সাথে আমি কম্প্রোমাইজ কখনোই করি না।
মাসউদুল হক : ’অগল্প’ প্রসঙ্গে আসি। এটা তো প্রথম গল্প বলছেন আপনি এবং এটার মূল বিষয় মুক্তিযুদ্ধই ছিল। পরবর্তী সময় কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আপনি তেমন কিছু লেখেননি বা লেখার কোন চেষ্টা করেন নি। হয়ত কখনও কখনও মুক্তিযুদ্ধের প্রসংগটি এসেছে প্রকটভাবে। তবে মূল উপজীব্য বিষয় হিসেবে নয়।
শাহাদুজ্জামান : মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সত্যিকার যে রকম সাহিত্য হওয়ার কথা সেরকম হচ্ছে না, এই একটা আক্ষেপ থেকে বলতে পার ‘অগল্প’ লেখা। এটা একটা গল্প লিখতে না পারার গল্প। পরবর্তীকালে ক্রাচের কর্নেল উপন্যাসে বেশ বিস্তৃতভাবেই মুক্তিযুদ্ধ এসেছে। এছাড়া আমার ‘মাজার, টেবিল টেনিস, আসলী মোরগ‘ গল্পটাতেও মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটটা আছে।
মাসউদুল হক :  ’মাজার, টেবিল টেনিস, আসলী মোরগ’ পড়েছিলাম। সেটা কি পরে শেষ করেছিলেন না ঐ অবস্থায়ই আছে জানি না। এটা কি একটি উপন্যাসে রূপ দেয়ার কথা ভাববেন?
শাহাদুজ্জামান : ওটা ঐ অবস্থাতেই আছে। ওটাকে একটা বড় গল্প হিসেবেই প্রকাশ করেছি। কোনদিন হয়তো এটাকে এক্সপান্ড করব।
মাসউদুল হক : ’ শিং মাছ, লাল জেল’ এর মতো কিছু গল্প আছে যেসব গল্প পড়লে মনে হয় আপনি নিজের সাথে নিজেই কথা বলছেন?
শাহাদুজ্জামান : এক অর্থে তো সব গল্পই নিজের সাথে কথা বলা। ঐ গল্পটায় আসলে আমি বরং আমার এক বন্ধুর মানসিক অবস্থাটাই ধরতে চেয়েছি। সে সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী এক একনিষ্ঠ রাজনৈতিক কর্র্মী ছিলো। তারপর সোভিয়েত ইউনিয়েনের পতন ঘটলে সে মানসিকভাবে খুবই বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। তার সেই মানসিক দ্বন্দ্বগুলোই ঐ গল্পে ধরবার চেষ্টা করেছি। সেখানে আমিও হয়তো আংশিকভাবে আছি।
মাসউদুল হক :  আপনার পাঠক হিসেবে আমার মনে হয়েছে,  ক্যাঙ্গারু দেখার শ্রেষ্ঠ দিন অনুবাদের আগে লেখা গল্পগুলো এবং পরবর্তী সময়ে লেখা গল্পগুলোর ফরম্যাটে পরিবর্তন ঘটে গেছে। আমরা দেখি, আগে আপনি লিখেছেন এমন  বিষয় নিয়ে আবার গল্প লিখেছেন। এখন যদি আমরা বলি,’ আন্না কারেনিনার জনৈক পাঠিকা’ গল্পের মধ্যে আপনার সাম্প্রতিক গল্প ’অন্য এক গল্পকারের গল্প নিয়ে গল্প’ এই গল্পের বীজ রোপণ করা ছিল?
শাহাদুজ্জামান : কীভাবে বল দেখি?
মাসউদুল হক : ’অন্য এক গল্পকারের গল্প নিয়ে গল্প’টিতে  আপনি কিন্তু জীবনানন্দ-এর একটি গল্প নিয়ে আপনার এক বন্ধুর সাথে আলাপ করেছেন। সেই আলাপের প্রতিচ্ছবি এই গল্পটি। আবার অনেকবছর আগে লেখা  ’আন্না কারেনিনার জনৈক পাঠিকা গল্প’ যখন লিখেছেন তখন সেখানে বইয়ের পাতায় পাতায় গ্রন্থের মালিক আর তার সম্ভাব্য প্রেমিকার গল্পের চরিত্র নিয়ে আলোচনাকে আপনি গল্পের ভেতরে তুলে এনেছেন। উভয় গল্পের ফরম্যাট একই। একটি বিখ্যাত গল্প নিয়ে আলোচনাকে কেন্দ্র করে আরেকটি গল্পের জন্ম দেয়া।
শাহাদুজ্জামান : এই দুটো গল্পের ফরমেটের ভেতর একটা মিল আছে ঠিকই বলেছ। তবে সেটা সচেতনভাবে না। হয়তো সাব কনসাসলি কাজ করেছে।
মাসউদুল হক :   ’আন্না কারেনিনার জনৈক পাঠিকা’ এবং ’অন্য এক গল্পকারের গল্প নিয়ে গল্প’Ñ এই দুই গল্পের মধ্যে সময়ের ব্যবধান কতদিন?
শাহাদুজ্জামান : পনের বছরের মত হবে।
মাসউদুল হক :  আমরা বলতে পারি, পুরনো গল্প থেকে আপনি বিস্মৃত হন না।  কারন ’সাড়ে সাতাশ’তে এসে আপনি আবার আপনার পুরনো লেখা রিভিউ করছিলেন। দেখা যাচ্ছে, আপনি রিভিউয়ের মধ্যে থাকেন; আপনার পুরনো জিনিসগুলো  নড়াচড়া করে দেখেন। আমার কাছে মনে হয় যে, আপনি লিখতে না পারলে একটা অস্বস্তির মধ্যে থাকেন যে, কিছু একটা লিখতে হবে আপনাকে।
শাহাদুজ্জামান : হ্যাঁ, সাড়ে সাতাশ গল্পটা মূলত আমার আগের গল্পের রিভিউ। সেসময় আমার একটা রাইটার্স ব্লক চলছিলো তখন আমি আমার পুরনো গল্পের চরিত্রগুলো নিয়ে বসলাম এবং তাদের সঙ্গে একধরনের ডায়লগ শুরু করলাম। সেটা নিয়েই ঐ গল্প। আমি ফিলিনির ফিল্ম ‘এইট এ্যান্ড হাফ’ দিয়ে প্রভাবিত হয়ে গল্পটা লিখেছিলাম। হ্যাঁ বলতে পারো লিখতে না পারলে আমি একটা অস্বস্তিতে থাকি। কিছু না কিছু আমাকে লিখতেই হয় অবিরত।
মাসউদুল হক :  ’অন্ধ শাহাজাহান’ গল্পটি কত সালে বের করেন? মানে এটা তো কাঙ্গারু শ্রেষ্ঠ দিন অনুবাদের আগে না পরে? 
শাহাদুজ্জামান : এটা তুমি জানতে চাচ্ছ কেন?
মাসউদুল হক :  জানতে চাচ্ছি এই জন্য যে, সেখানে কয়েকটি ধারণা আছে। ’লিভিং টুগেদার অ্যান্ড লিভিং এপার্ট টুগেদার।’ তার পর আবার মায়া সভ্যতার কথা বলেছেন যে তারা একদিন নগর ছেড়ে অন্য নগরে চলে গেলো। ঐটারই ধারাবাহিকতার পরে আমরা পাই ’মহাশূন্যে সাইকেল’ এ। তারাও একটা গ্রহ থেকে আর একটা আলোক বর্ষে চলে যাচ্ছে। তো আমার মনে হয়েছে, আপনার ভাবনাটা শুরু হয়েছে ঐ সময়টা থেকে। আমি বলতে চাইছি আপনার যে পরিবর্তন তা শুরু হয়েছে ’কাঙ্গারু দেখার শ্রেষ্ঠ দিন ’ অনুবাদেরও আগে। মূলতঃ শুরু হয়েছে ’অন্ধ শাহাজাহান’ এ। অ্যান্ড ভেরি ইন্টারেস্টিং যে, তখন আপনার বয়স ৪৫ অতিক্রম করেছে।
শাহাদুজ্জামান : আমি প্রথম বিদেশে পড়তে যাই ১৯৯৬এ। দেশ এবং প্রবাসের অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে আমার চিন্তার একটা পরিবর্তন শুরু হয়। সেটা ঠিকই যে তা বেশ আগে থেকেই, ’কাঙ্গারু দেখার শ্রেষ্ঠ দিন’ অনুবাদেরও আগে। ‘অন্ধ শাজাহান‘ গল্পটা লিখি আমি ২০০১ এ টুইন টাওয়ার হামলার পরে । গল্পে সেটার রেফারেন্স আছে।
মাসউদুল হক :  কোন কোন জিনিস আপনি রিপিট করেন। যেমন ’শাহজাহান’ একাধিকবার আপনার গল্পে এসেছে।
শাহাদুজ্জামান : এই শাহাজাহান তো স¤্রাট শাহাজাহান আর ঐ শাহাজাহান তো হচ্ছে রাস্তার গায়ক শাহাজাহান।
মাসউদুল হক :  লক্ষণীয় বিষয় আগে আপনি মানুষকে দেখতেন। আমরা শাহজাহানের কথা এই জন্য বললাম যে ২০০১ সালের দিকে থেকে আসলে আপনি অনেকটা নিজের দিকে ফেরা শুরু করেছেন। মানে টার্নিং পয়েন্ট, আপনি একটা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছেন। সেটা আস্তে আস্তে ‘মহাশূন্যে সাইকেলের‘ দিকে টার্ন নেয়। যদি গল্পগুলো ধারাবাহিকভাবে পড়ি তখন আপনি আসলে নিজের দিকে তাকান নাই। এবং সেই সাথে কিন্তু প্রবাস জীবনটা জড়িত খেয়াল করছেন? আপনি যখন আস্তে আস্তে একটা অভ্যস্ত সমাজ থেকে বের হয়ে যাচ্ছেন তখন আপনার মধ্যে একটা সেলফ কনশাসনেস এর জায়গা তৈরি হচ্ছে। তখন আপনি পুরনো গল্পগুলো নিয়ে বা আপনার নিজের লেখা নিয়েও ভাবা শুরু করলেন। তারপরে ’মহাশূন্যে সাইকেল’ আসলো। মহাশূন্যে সাইকেল তো বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ গল্পগুলোর মধ্যে একটি। অনুবাদ হওয়া প্রয়োজন।
শাহাদুজ্জামান: আমার প্রবাস জীবনের সাথে নিজের দিকে তাকানোর যে সম্পর্ক তুমি দেখাচ্ছ সেটা খুব ইন্টারেস্টিং এবং তার সত্যতা আছে। আমি এভাবে ভেবে দেখিনি আগে। মহাশূন্যে সাইকেল আমার নিজেরও খুব পছন্দের একটা গল্প।
মাসউদুল হক :  ’মহাশূন্যে সাইকেল’ এ যে ভাবনার অবতারণা ঘটিয়েছেন তা কি আপনার নিজস্ব চিন্তাপ্রসূত না-কি ভাবনার মূল এসেন্সটা ধার করা?
শাহাদুজ্জামান :  এ গল্পের এসেন্সটা আমারই, কারো কাছে ধার করা না। তবে ঐ যে নিজেকে টেলিফোন করা এই ভাবনাটা এসেছে একদিন একজনের সাথে কথা বলতে বলতে। কি প্রসঙ্গে সে যেন বলছিলো আচ্ছা নিজের বাসায় ফোন করে নিজেকেই যদি চাওয়া যায় তাহলে ব্যাপারটা কেমন হয়? এটা নিয়ে আমরা মজা করেছিলাম। পরে  অস্তিত্ব, বিচ্ছিন্নতা, দূরত্ব এইসব ভাবনাকে উপস্থিত করতে গিয়ে ঐ টেকনিটকটাকে ব্যবহার করেছি।
মাসউদুল হক : আপনার অনেকগুলো গল্পের শুরুতে কিছু হেয়ালী আছে যেমন ’বুক শেলফে বাঘ’ আপনি সরাসরি স্বীকারও করেছেন, আপনি তো হেয়ালি করেন। এটার পেছনে কারণটা কি?
শাহাদুজ্জামান :  শিবু কুমার শীল আমার একটা সাক্ষাৎকার নিয়েছিলো তাতে সে বলেছিলো যে আমি গল্পের শুরুতে অনেকটা ক্রিকেটের লুজ বল দেয়ার মত পাঠককে প্ররোচিত করে গল্পের ভেতর ঢুকিয়ে নেই তারপর তাকে একটা ভিন্ন অভিজ্ঞতার ভেতর নিয়ে যাই। কথাটা আমার পছন্দ হয়েছে। এই টেকনিকটা আমি সম্ভবত অবেচতনভাবে নিয়েছি রাস্তার পাশে ঔষধ বিক্রেতা ক্যানভাসারদের কাছ থেকে। একসময় আমি এই ক্যানভাসারদের বক্তৃতা প্রচুর শুনতাম। তারা কিন্তু তার ঔষধ বিক্রি করবার জন্য আগে নানারকম মজাদার গল্প শোনাতো যার সঙ্গে ঔষধের কোন সম্পর্ক নাই। আমি একধরনের হেয়ালির ভেতর দিয়ে এভাবে হয়তো পাঠকদের জালে আটকে ফেলবার চেষ্টা করি যাতে গল্পের শেষ ঔষধটা সে খায়।
মাসউদুল হক :  ফুটবলে রোমারিও যেমন অনেকক্ষণ ডি বক্সের আশেপাশে ঘুরে একটা ফাঁক খুঁজে বের করার জন্য। সে জানে, ড্রিবলিং করতে থাকলে এক সময় একটা ফাঁক দিয়ে গোলবারে বলটা চালিয়ে দেয়া যাবে। আপনি কি ফাঁকটা জেনেই বল নিয়ে ঘুরেন না-কি ফাঁকটা এক সময় বের হবে এরকম একটা সম্ভাবনা মাথায় রেখে শুরু করেন?
শাহাদুজ্জামান: হ্যাঁ বলতে পারো ঐ ফাঁকের ফাঁদের মধ্যে পাঠককে ফেলে দেয়া। পাঠক পাঠিকা একধরনের প্রত্যাশা নিয়ে গল্পে ঢোকে কিন্তু হয়তো একটা সারপ্রাইজ তার জন্য অপেক্ষা করে।
মাসউদুল হক : আপনি বাংলাদেশের সাহিত্যিকদের মধ্যে সাক্ষাৎকার নিয়েছেন যেমন, হাসান আজিজুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস এবং শহীদুল জহির-এর।
শাহাদুজ্জামান : না শহীদুল জহিরের ফরমাল সাক্ষাৎকার নেওয়ার কথা ছিল, নেয়া হয়নি। এক শুক্রবারে বসার কথা ছিলো তার সাথে কিন্তু তার দুদিন আগে তিনি মারা গেলেন।
মাসউদুল হক : এর মাঝখানে তো আরও অগ্রজ সাহিত্যিক আছেন। এদের মাঝখান থেকে আপনি এই মাত্র ক’জনের বিষয়ে আগ্রহী হলেন কেন?
শাহাদুজ্জামান : বাংলাদেশের বিভিন্ন জনের লেখা আমি পড়ি। কিন্তু আমাকে সবাই আগ্রহী করে না। সবকিছু মিলিয়ে হাসান আজিজুল হক, ইলিয়াস ভাই আমাকে কৌতূহলী করেছে এবং শহীদুল জহিরও করেছে। আর বাকিদের লেখাপত্র পড়ে আমার মনে হয়েছে যে আমি মোটামুটি তাদের বুঝতে পারছি, প্রশ্ন করে তাদের আরও ভেতরে ঢোকার আগ্রহ হয়তো ততটা বোধ করিনি।
মাসউদুল হক :  যাদেরকে আপনার সময় আপনি জীবিত পান নাই, এমন যদি কারও সাক্ষাৎকার নেয়ার সুযোগ পান তাহলে আপনি কার কার সাক্ষাৎকার নিবেন?
শাহাদুজ্জামান : জীবনানন্দ দাশ।
মাসউদুল হক :  সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ?
শাহাদুজ্জামানঃ হ্যা ওয়ালীউল্লাহও। সময়ের তুলনায় অনেক এগিয়ে থাকা লেখক তিনি। তার ‘কাঁদো নদী কাঁদো‘ তো অসাধারণ কাজ, লেখার ফর্ম, কনটেন্ট দু দিক দিয়েই।
মাসউদুল হক : এখন আপনার ভাবনার একটা বড় অংশ জুড়ে কি ’এগজিসটেনসিয়ালিজম‘ সংক্রান্ত ভাবনা জায়গা করে নিয়েছে?
 শাহাদুজ্জামান : অস্বিত্ববাদ তো একটা দার্শনিক ধারণা। আমি ঠিক সে ধরনের দর্শন দিয়ে প্রভাবিত হয়ে লিখি নাই। তবে ব্যক্তির অস্তিত্ব তো সবসময় আমার আগ্রহের বিষয়। কিন্তু ব্যক্তিকে আমি বড় প্রেক্ষপটের ভেতর দেখার চেষ্টা করি। তুমি বললে যে আমি রূপবান এর কাহিনী বলতে গিয়ে রূপবান যে জঙ্গলে আছে সেই জংগলটাও দেখতে চাই।
মাসউদুল হক : আপনার সময় যখন লিখছেন তার আগে পরে অর্থাৎ সেই সময় অনেকেই চিত্রকলা, গল্প উপন্যাস সবজায়গাতে ফ্রয়েডিজম দ্বারা অনেক বেশি প্রভাবিত ছিলেন। আপনার উপর তার কোন  প্রভাব আছে কি?
শাহাদুজ্জামান : বিশ শতকের পশ্চিমা ভাবনার কয়েকজন মানুষকে বোঝা যেকোন চিন্তাশীল মানুষের জন্য জরুরী, যেমন মার্ক্স, ফ্রয়েড আর আইনষ্টাইন। আমি একসময় এদের লেখাপত্র মনোযোগের সাথে পড়েছি। মানুষের অবচেতন মনকে বোঝার ক্ষেত্রে ফ্রয়েডের তো বড় ভুমিকা আছে। সেটা লেখালেখিতে তো অবশ্যই প্রভাব ফেলে। তবে আমি ফ্রয়েডের মার্ক্সিষ্ট ক্রিটিকে আগ্রহী ছিলাম। ফ্রয়েড ব্যক্তির উপর বেশী জোর দিয়েছেন। আমি বরং পছন্দ করতাম মনোবিজ্ঞানী ইয়ুংকে, যিনি যৌথ অবচেতনার কথা বলেছেন। আমি ইয়ুংএর লেখা অনুবাদও করেছি।
মাসউদুল হক :  মনোবিজ্ঞানী ইয়ুং-এর সুত্র ধরেই বলি, আপনি যখন লেখেন তখন আপনার সচেতন মন বা ব্যক্তিগত অবচেতন মন কি যৌথ অবচেতন মনের চিন্তাকে অতিক্রম করতে পারে? লেখকের জন্য এই অতিক্রম কি জরুরী?
শাহাদুজ্জামান : এই যৌথ অবচেতনাকে তো ঠিক অতিক্রম করা যায় না। বরং এর ব্যাপারে সচেতন হওয়া যায়। ঋত্বিক ঘটকের ছবিতে এধরনের কালেকটিভ আনকনশাস, আর্কিটাইপ এসব ধারণার প্রতিফলন আছে। তার অযান্ত্রিক ছবিটা তার একটা উদাহরন।
মাসউদুল হক : আপনি সাবঅলটার্ন স্টাডিজের কথা বলছিলেন। গ্রামের যে সাব অলটার্ন জীবন সেটা কি আর আগের মত আছে? সাব অলটার্নদের জীবন তো বদলে গেছে।
শাহাদুজ্জামান : সাবঅলটার্ন স্টাডিজ তো একটা হিস্টোরিকাল পারসেপেকটিভ, একটা থিউরিটিক্যাল জায়গা। পোষ্ট কলোনিয়াল ষ্টাডিজের ভেতর সাব অলটার্ন তাত্ত্বিকদের এক বড় ভূমিকা আছে। আমি এই পারসপেকটিভকে আজকের পৃথিবী বুঝতে খুবই প্রয়োজনীয় মনে করি। এটা শুধু গ্রামের মানুষের ব্যাপার না, এটা পুরো আধুনিকতাকে বোঝার ক্ষেত্রে একটা গুরত্বপূর্ণ পারসপেকটিভ। সাব অলটার্ন তাত্ত্বিকদের ভেতর দীপেশ চক্রবর্তীকে আমার খুব সিগনিফিকেন্ট মনে হয়। এক্ষেত্রে অলটারনেটিভ মডার্নিটির ধারণা আমার কাছে খুব আকর্ষণীয় মনে হয়।
মাসউদুল হক : আপনার ’কথা পরম্পরা’ বইয়ের সূত্রে মিলান কুন্ডেরার ভাষায় উপন্যাস হলো ফাঁদে আাটকে পড়া মানুষের জীবনের ব্যবচ্ছেদ। আপনিও কি তাই মনে করেন?
শাহাদুজ্জামান: কথা তো ঠিকই। এই যে আমি একটা দেশে, একটা ধর্ম পরিচয়ে একটা বিশেষ সময়ে জন্ম নিয়েছি এটা তো আমার চয়েস না, আমি একটা ফাঁদেই পড়েছি। এখন আমার সারা জীবনের কাজ এই ফাঁদে আটকে পড়াকে বোঝা, ব্যবচ্ছেদ করা। প্রত্যেকটা মানুষই এমন এক একটা ফাঁদে আটকে পড়ে থাকে। বিটলসের একটা গান আছে, ‘ইউর লাইফ ইজ হোয়াট হেপেনস টু ইউ হোয়েন ইউ আর মেকিং আদার প্ল্যানস।‘ তুমি যখন তোমার জীবন নিয়ে নানা পরিকল্পনা করছ তখন তোমার জীবনে অনেক কিছু ঘটে যায়, যা তোমার পরিকল্পনার বাইরে, সেটাই হচ্ছে আসল জীবন। তো কুন্ডেরার কথা তো ঠিক বলেই মনে করি। আমরা কে কিভাবে ফাঁদে আটকে আছি সেটার ব্যবচ্ছেদ করাই লেখকের কাজ। আমি যে গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, গবেষণা, অনুবাদ একের পর এক করে চলেছি সেটা জীবনকে ঐ ব্যবচ্ছেদ করার একটা লোভ থেকেই।
মাসউদুল হক : এর পরে যদি আবার জীবন পান তবে বর্তমান সত্তাগুলোর মধ্যে কোন সত্তাকে রাখবেন বা বাতিল করবেন? অন্যভাবে বললে, একই রকম পৃথিবীতে আপনি যদি আবার আসেন, সেক্ষেত্রে আপনি কোন কোন জিনিসগুলো রাখবেন আর কোন কোনগুলো বাতিল করে দেবেন।
শাহাদুজ্জামানঃ আমার লেখক সত্তাকেই বাঁিচয়ে রাখতে চাইব। লেখা আমার কাছে জীবনের সবচেয়ে আনন্দের এবং অর্থময় কাজ মনে হয়। সাহিত্যের ভেতরই একটা বিস্তৃত জীবনযাপন সম্ভব। জীবিকার জন্য অনেক সময় মনের বিরুদ্ধে অনেক কাজ করতে হয়েছে সেগুলোকে হয়তো বাতিল করার চেষ্টা করব। জীবন আর জীবিকাকে মেলাবার চেষ্টা করব। এখন তো জীবন জীবিকার সাথে লুকোচুরি করে সাহিত্য করতে হয়। তবে জীবন তো আর আমার একার উপর নির্ভর করে না। আমি যে সমাজে জন্মাব, যে সময়ে জন্মাব তার প্রভাব থাকবে আমার উপর। তবে যতগুলো জীবনই পাই না কেন এটা জানি যে কোন জীবনই পূর্ণাঙ্গ তৃপ্ত জীবন হবে না, অসম্পূর্ণতা থাকবেই। ফলে যে জীবনেই আসি না কেন জীবনকে ব্যবচ্ছেদ করাই হবে আমার কাজ। তবে কে জানে মানুষ না পশু পাখী হয়ে জন্মাব। জীবননান্দ অবশ্য পাখী, ফড়িং, ঘাস যা কিছু হয়েই জন্মাতে চেয়েছেন। এসব হলে কি আর সাহিত্য করা যাবে? অবশ্য সনাতম ধর্ম মতে বারবার জন্ম নেয়া খুব ভালো কোন কাজ না। আত্মাকে নশ্বর দেহ থেকে চূড়ান্ত মুক্তি দেয়াই প্রধান কাজ বলে তাদের ধারণা।
মাসউদুল হক : আপনার কিছু কিছু ভাবনা আছে যা মৌলিকতো বটেই; বিরলও বলতে পারেন। যেমন, গাছ যে বেড়ে ওঠে আপনি তার সে-ই বেড়ে ওঠার শব্দ শুনতে পান বা  টয়োটা গাড়ির টায়ারে টগরের গন্ধ ভরা বাতাস ঢুকানো থাকে সেটা আপনি লক্ষ্য করেন। এ ধরনের ভাবনাগুলো  আপনার মাথায় কি করে ্্্্আসে?
শাহাদুজ্জামানঃ আসলে শুনবার মত মন থাকলে অনেক কিছুই শোনা যায়, ইয়েটসের একটা কবিতা আছে তুমি ঠিক মত কান পাতলে বনের কাঠবেড়ালীর হৃদস্পন্দনও শুনতে পাবে, জীবনানন্দ তো শিশিরের শব্দও শুনতে পেতেন। কিন্তু আমাদের সেই ধ্যানস্থ হবার সময় কোথায়? না গাছ বেড়ে ওঠা দেখতে পাই না কিন্তু দেখার আকাক্সক্ষা করি। আমার লেখাগুলোতে সেই আকাক্সক্ষার কথাই বলে থাকি।
মাসউদুল হক : লেখকের কি অহংকার বা আভিজাত্য থাকা দরকার?
শাহাদুজ্জামান: তুমি ঠিক কি অর্থে অহংকার বা আভিজাত্যের কথা বলছো জানি না। তবে কথা হচ্ছে, আমার জীবনের অভিজ্ঞতাটা গুরুত্বপূর্ণ, এই ভাবনাটা থাকা দরকার। আমি পৃথিবীর ৭০০ কোটি মানুষের একজন কিন্তু ঠিক আমার মত কেউ নাই। আমার জীবনের একটা ইউনিকনেস আছে। এই স্বাতন্ত্র্যতার প্রতি বিশ্বস্ত থাকা দরকার। নিজের প্রতি এই বিশ্বস্ততা একধরনের আভিজাত্য তৈরী করতে পারে। লেখকের সেই আভিজাত্য থাকতে পারে। তার মানে এই বোধ না যে আমার জীবনটাই হচ্ছে সবচেয়ে ভালো, গুরত্বপূর্ণ, আমি সবচেয়ে বেশী বুঝি এসব। সেগুলো হচ্ছে স্থূলতা। এগুলো থেকে অহংকার জন্ম নিতে পারে। সেটা বাজে ব্যাপার। লেখকের বিনয় থাকা উচিৎ বলে আমি মনে করি।
মাসউদুল হক : আপনি যদি দেখেন যে, আপনার মতো করে এরকজন গল্প লিখছেন বা আপনার চেয়ে ভাল গল্প লিখছেÑ তখন কি আপনার মধ্যে ঈর্ষা বা তাকে অতিক্রম করার কোন তাগিদ তৈরি হয় না।
শাহাদুজ্জামানঃ লেখকদের ভেতর সুস্থ প্রতিযোগিতা থাকা ভালো। সমসমায়িককালে আশে পাশে কাউকে ভালো লিখতে দেখলে তাকে ঠিক বরং না নিজেকেই আরো অতিক্রম করার ইচ্ছা জাগে। শহীদুল জহিরের লেখা পড়ে, তার সঙ্গে কথা বলে আমি নিজের লেখাতেই আরো মনোযোগী হবার অনুপ্রেরণা পেতাম।
মাসউদুল হক : শহীদুল জহিরের একটা নিজস্ব স্টাইল ছিল। আপনি তো তার ভীষণ ভক্তও বটে। আমার পর্যবেক্ষণ হলো, উনি যে স্টাইলে লিখতেন তার একটা সুবিধা ছিল। সুবিধাটা ছিল এই জন্য যে, ছোট একটা বিষয়টাকে  নিয়ে অনেক কিছু করতে পারতেন। কিন্তু সেক্ষেত্রে দেখা যেত যে, পাঠক ঐখানেই ঘুরপাক খাচ্ছে। বেশি স্পেস নিয়ে উনি কিন্তু গল্প লিখেন নাই।
শাহাদুজ্জামান: শহীদুল জহিরের শক্তি দুর্বলতা নিয়ে আমি লিখেছি ‘শহীদুল জহিরের দিকে দেখি‘ নামে একটা লেখায়।  আমার কাছে উনার দেখার চোখটা ইন্টারেস্টিং।
মাসউদুল হক : (ইন্টারেস্টিং বিষয় হলো, আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শহীদুল জহির স্মৃতি সংসদ এর আয়োজনে একটি প্রবন্ধ পাঠ করেছিলাম  প্রবন্ধের নাম ছিল শহীদুল জহিরঃ দেখার চোখ) আপনি কি মনে করেন যে সংসার জীবন সৃষ্টিশীল মানুষদের জীবনের জন্য অন্তরায়?
 শাহাদুজ্জামানঃ সংসার জীবন সৃষ্টিশীল মানুষের জন্য অন্তরায় হতেই পারে। আমাদের দেশে সংসার যাপনের ঝক্কি তো অনেক। দেশের সবকিছুর সিস্টেমই যেহেতু নড়বড়ে ফলে বৈষয়িক ব্যাপারগুলো ঠিক ঠাক চালাতে অনেক শ্রম ঘাম ঝরাতে হয়। সেখানে অন্যমনস্কতার সুযোগ নাই। কিন্তু সৃজনশীল মানুষকে তো কখনো কখনো অন্যমনস্ক হতে হয়, এটা তার জন্য প্রয়োজন। তখন সংসারের অপর সঙ্গীর উপর ভারটা বেশী পড়ে, সেখান থেকে তিক্ততার সৃষ্টি হয়। তবে উদ্ধার পাওয়া যায় যদি সঙ্গী আন্ডারস্ট্যান্ডিং হয়। লেখালেখি বাউলরা যেমন বলে যে বাতাসে গেরো দেয়ার কাজ। এই কাজটা তার সঙ্গী গুরুত্বর্পূণ মনে করে কিনা সেটার উপর নির্ভর করবে সংসার সৃজনশীল মানুষের জন্য অন্তরায় হবে কিনা।
মাসউদুল হক : আপনি যেহেতু চিকিৎসক ছিলেন সেহেতু প্রাইভেট প্র্যাকটিস করার কথা। আমার কেন যেন মনে হয় আপনি প্রাইভেট প্র্যাকটিস করেননি? বা যদি করেও থাকেন এই যে পরামর্শের বিনিময়ে ফিস নেয়াÑ এই বিষয়টিকে কি অন্য সবার মতো খুব প্রফেশনালি দেখতে পারতেন?
শাহাদুজ্জামানঃ না আমি চেম্বারে বসে প্র্যাকটিস করা ডাক্তার কখনোই ছিলাম না। পাশ করার পরই আমি ব্রাকের গ্রামীর স্বাস্থ্য প্রকল্পে ডাক্তার হিসেবে যোগ দিই। ওটা ছিলো মূলত পাবলিক হেলথের কাজ, ফিস দিয়ে রোগী দেখার ব্যাপার না। আসলে আমার পেশা নিয়ে একসময় নানা টানাপোড়েন গেছে। মধ্যবিত্ত পরিবারে ভালো রেজাল্ট করা ছেলে তাদের সামনে অবভিয়াস অপশন হচ্ছে ডাক্তারী, না-হয় ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া। আমার বাবা ইঞ্জিনিয়ার ফলে সবাই বললো ডাক্তারী পড়। পেশা নিয়ে তেমন বিশেষভাবে তো ভাবিনি তখন। আমাদের দেশে ছেলেমেয়েদের ক্যারিয়ার প্ল্যানিং নিয়ে তেমন তো কোন চর্চা নাই। এখন তাও কিছু আছে, আমাদের সময় তো এসব কোন ভাবনাই ছিলো না। তাছাড়া ক্যাডেট কলেজে পড়েছি, তারা তো চাইত আর্মিতে যাই। আর্মিতে যে যাব না সে ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলাম। সাহিত্য ভালো লাগত কিন্তু সাহিত্যকে পড়ার বিষয় ভাবার কোন সুযোগ ছিলো না। ইকোনমিক্স পড়ার কথা ভেবেছিলাম। সে ব্যাপারে সিরিয়াস হলে সেটা হয়তো হতো কিন্তু আমার মেডিকেল ভর্তির রেজাল্ট বের হলো আগে। খুব একটা আর না ভেবে ভর্তি হয়ে গেলাম চিটাগাং মেডিকেল কলেজে। কিন্তু আগেই বলেছি মেডিকেল পড়া অবস্থায় আমার ইনভলভমেন্ট অনেক বেড়ে গেল নানারকম সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে। মানুষ তো জীবনের একটা মিনিং খোঁজে। ডাক্তারীর চেয়ে শিল্পসাহিত্যের ভেতর থাকাটাকেই বেশী মিনিংফুল মনে হলো আমার কাছে। ডাক্তারী পড়া একসময় ছেড়েই দিলাম। তোমাকে বলেছি আগে যে ফিল্ম নিয়ে মেতে উঠেছিলাম, মস্কো, পুনা এসব ফিল্ম ইন্টটিউটে ভর্তির চেষ্টা করছিলাম। আমার এসব পাগলামীতে পরিবার স্বভাবতই খুব উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছিলো। পরিবারের সাথে নানা আবেগঘন এপিসোড গেছে এসব নিয়ে। এক পর্যায়ে আব্বা বললেন ঠিক আছে তোমার ডাক্তারী করতে হবে না, শুধু পাশটা করো, তারপর যা ইচ্ছা করো। আমি যা করতে চাইতাম আমার মা অবশ্য সাপোর্ট করতেন। বাবাও করতেন। কিন্তু ছেলের ভবিষ্যত নিয়ে শঙ্কিত হতেন স্বাভাকিবভাবেই। যাহোক আমি পরে গ্যাপ দিয়ে আবার মেডিকেল পড়ি, পাশ করি। মনে আছে মেডিকেল সার্টিফিকেটটা আব্বাকে পোষ্ট করে পাঠিয়ে লিখেছিলাম, এটা তোমার জন্য। পেশা হিসেবে ডাক্তারী তো চমৎকার একটি পেশা, কিন্তু এক এক জনের মাইন্ড সেটটা তো এক এক রকম। আমি ভাবতাম আমার জীবনের এতরকম বিষয়ে আগ্রহ, শিল্প সাহিত্যে একটা কিছু করতে চাই কিন্তু শুধু চেম্বারে বসে বা হাসপাতালে রোগী দেখলে সেই সুযোগগুলো পাব কই। তখন গোপানে খোঁজ করতাম লেখকদের মধ্যে কে ডাক্তার। জেনে বেশ সাহস পেতাম যে বনফুল ডাক্তার ছিলেন, চেকভ, সমরসেট মম ডাক্তার ছিলেন। যাহোক আমি এমন একটা পেশা খুঁজছিলাম যাতে আমার ডাক্তারী জ্ঞানটাকে কাজে লাগাতে পারব কিন্তু আমার অন্য কাজ করারও সময় থাকবে। আমাদের দেশে চিকিৎসা পেশার পরিস্থিতি তো নানাভাবে জটিল। আমি যখন ফিল্ম নিয়ে মশগুল তখন একবার হাসান আজিজুল হকের ‘পাতালে হাসপাতালের‘ গল্পটাকে ফিল্ম বানানোর চেষ্টা করেছিলাম। যাহোক পাশ করার পর নিশ্চিত ছিলাম না কি করব। সেসময় ব্রাকের রুরাল হেলথ প্রজেক্টে কাজ করার সুযোগ পাই। কাজটা ভালো লেগে যায়। এরপর পাবলিক হেলথ গবেষণা, শিক্ষকতা এটাকেই পেশা হিসেবে নেই। চিকিৎসা নৃবিজ্ঞানের পিএইচডি করি। আমার পিইচডির গবেষণা ছিলো বাংলাদেশেরই একটি হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা। সুতরাং আমি চেম্বারে বসে রোগী দেখিনি ঠিকই কিন্তু স্বাস্থ্য গবেষণা আর শিক্ষকতার মাধ্যমে আমার ভূমিকা রেখেছি, রাখছি। একাজ আমার লেখালেখিকেও সাহায্য করছে নানাভাবে। চেম্বারে বসে রোগী দেখলে আমার জীবন কেমন হতো জানি না। তবে মনে হয় আমি ব্যাপারটা উপভোগই করতাম। আমার হিউম্যানেটিজের জ্ঞান হয়তো আমাকে মানবিকভাবে চিকিৎসা করতে সাহায্য করতো। তবে চিকিৎসা এখন যেভাবে পণ্য হয়ে উঠেছে তাতে কতটা সফলভাবে তা করতে পারতাম কে জানে। আমি আমার পেশা নিয়ে এখন খুশী। অনেক লম্বা উত্তর দিলাম কারণ তুমি এমন এক প্রশ্ন করেছ যা নিয়ে আমি নিজেই দ্বন্দ্বে ভুগেছি অনেকদিন।
মাসউদুল হক : এই যে বিদেশে থাকছেন, বিদেশি সাহিত্য এবং তাদের চিন্তা গ্রহনের সুযোগ পাচ্ছেনÑ এগুলো কি আপনার ইদানিংকালের লেখায় প্রভাব ফেলছে বলে মনে করেন?
শাহাদুজ্জামান : বিদেশী সাহিত্য তো আমি পড়ছি অনেকদিন থেকেই, তার সাথে বিদেশে যাওয়ার কোন সম্পর্ক নাই। তবে বিদেশে জীবনযাপন করার কারণে আমার চিন্তা ভাবনার উপর অনেক প্রভাব পড়েছে। কাজের সূত্রে পৃথিবীর নানা প্রান্তে ঘুরতে হয় আমাকে। এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকার অনেক দেশে গিয়েছি আমি। এইসব অভিজ্ঞতা নিশ্চয়ই আমার চিন্তায় ভূমিকা রেখেছে। আজকের এই গ্লোবালাইজেশনের যুগে যে কোন কাজ করতে গেলেই বিশ্ব প্রেক্ষাপটটা মাথায় রাখা দরকার। দেশের জীবন নিয়ে সাহিত্য করলেও ঐ বিগ পিকচারটা ভাবনার ভেতর থাকা দরকার। সেসব দেশে সশরীর অভিজ্ঞতা অনেক মনকে উন্মুক্ত করে। তাছাড়া আমি বৃটেনে গত ৫/৬ বছর ধরে আছি। একটা দেশে বেড়াতে আসা আর অনেকদিন ে সখানে থাকার অভিজ্ঞতা ভিন্নরকম। এসব দেশের অনেক ভেতরের রূপটা বোঝা যায়। এদের শক্তি, দুর্বলতাটা বোঝা যায়। আর বিদেশে থাকতে থাকতে নিজের দেশকেও নতুন করে চেনা হয়। এর প্রভাব আমার নতুন লেখায় নিশ্চয়ই আছে। 
মাসউদুল হক : ‘দূরগামি কথার ভেতর’ বইয়ের সাক্ষাৎকারগুলোতে দেখা যায়, আপনাকে যখন প্রশ্ন করা হয় এসময়ের কার লেখা ভাল লাগে তখন আমার মনে হয়েছে আপনি নির্দিষ্টভাবে কারো নাম উল্লেখ করেন না।  কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর তার নেয়া সাক্ষাৎকারে যেমন অনেকটা জোর করিয়ে আপনার মুখ দিয়ে দু’একজন সম্পর্কে কথা বলিয়ে নিয়েছে। তখনও কিন্তু আপনি মতামত ব্যক্তকরণে সতর্ক ছিলেন। সাহিত্য এবং ব্যক্তিগত জীবন সবখানেই আপনার মধ্যে এক ধরনের সতর্কতা দেখতে পাই বলে মনে হয়। আপনার মতামত কি?
শাহাদুজ্জামানঃ  আসলে কার লেখা ভালো লাগে এই প্রশ্নের উত্তরে অনেক রকম দায় থেকে লম্বা নামের তালিকা দেয়ার একটা রেওয়াজ দেখেছি অনেকসময়। কোন রকম দায় ছাড়া যাদের নাম আমি অকপটে বলতে পারি তাদের নাম আমি আমার সাক্ষাৎকারে বলেছি। তবে হয়ে লেখালেখি আমার কাছে একটা সতর্ক কাজ। যখন লিখি প্রতিটা লাইন ভেবে সতর্কতার সাথে লিখি, অনেকবার বদলাই। আমি ঠিক স্বতঃস্ফূর্ত, চারণ ধারার লেখক না যে লিখতে বসলেই তর তর করে লেখা চলে আসে। বলতে পারো  আমার জীবন যাপনেও সেই সতর্কতাটা আছে। কিন্তু সবসময় তা ছিলো না। আমি একসময় লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে ঘোর গ্রস্তের মত জীবন যাপন করেছি। জীবনের প্রচলিত হিসাব সব বাদ দিয়েছিলাম। তবে একেবারে ঠিক বেসামাল জীবন যাপন আমি করিনি কখনো। খুব বেসামাল জীবনাযাপন করেও অসাধারণ লেখা লিখেছেন অনেক লেখক। সেটা যার যার ধরন। অনেককে এমন ভাবতে দেখেছি যে সাহিত্য করতে হলে বেসামাল জীবন যাপন করতে হবে। ওসব হাস্যকর ধারণা। লেখালেখিকে যখন সিরিয়াসলি নিয়েছি তখন জীবনযাপনে সতর্ক হয়েছি। মনে হয়েছে অপচয় করার মত সময় তো আমাদের হাতে বেশী নাই। তাছাড়া আগেই বলেছি আমাকে বেশ কয়েকটা জীবনকে সামাল দিতে হয় ফলে এখন সতর্ক জীবন যাপন ছাড়া উপায় নাই। তবে সতর্ক থাকলেই কি আর একেবারে অংক কষে জীবন যাপন করা যায়? ঐ যে একটা গান আছে না, ‘পথ ভোল, হে সাবধানী পথিক।‘ সে গানও মনে বাজে মাঝে মাঝে।

(আপনার সাথে সাক্ষাৎকারটি শেষ করছি বলবো না। বলবো স্থগিত রাখছি। আপনার সাহিত্য-ভাবনা-চিন্তা বা পরিবর্তনকে যারা খুব কাছ থেকে দেখেছেন যেমনÑ মিলন চৌধুরী, এনামুল হক মুকুল, ঢালী আল মামুন এবং পাপড়ীন নাহারের সাথে আমি আলাদাভাবে কথা বলার ইচ্ছে রাখি। তাদের সাথে কথা বলে আবার আপনার সাথে কথা বলবো কোন একদিন এবং নিশ্চিতভাবে এ সময় আপনি আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ লেখা লিখবেন। সেগুলো নিয়েও কথা থেকেই যাবে।)