প্রবন্ধ
কবিতার ভিত্তি
আমিরুল বাশার

গল্প
ফজলুল আলম

নিবন্ধ
রবীন্দ্রনাথের নন্দলাল
শেখ মিরাজুল ইসলাম

উপন্যাস
আর জে রাজহংসী
মারুফ রায়হান

বিশ্বসাহিত্য
শতবর্ষের নীরবতা
আকিল জামান ইনু

গদ্য
কবিতা কি জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে

জর্নাল
নুরুল করিম নাসিম

শিল্পকলা
বাংলাদেশের চিত্রকলায় রেখা
নাজিব তারেক

বইপত্র

বিশেষ রচনা
হোমারের জন্য প্রশস্তিগাথা
অনুবাদ: মাসরুর আরেফিন

স্মরণ
 সৈয়দ শামসুল হক

জীবনকথা
এক আশ্চর্য বয়স
ওয়াসিমা ওয়ালী

অনুবাদ গল্প
বন্ধন
ডাব্লিউ ডাব্লিউ জেকবস
অনুবাদ: তানিয়া হাসান

টরেন্টোর চিঠি
শামীম আহমেদ

অস্ট্রেলিয়ার চিঠি
ফজল হাসান

এবং
কবিতাগুচ্ছ

১০ বর্ষ ১ সংখ্যা
আগস্ট ২০১৭

লেখক-সংবাদ : ছোটগল্পে ছোট ছোট বোমা ফাটানোর নতুন কৌশল আফসান চৌধুরীর * উপন্যাস লিখছেন কাফকা-সাহিত্যের অনুবাদক-ব্যাখ্যাকারী মাসরুর আরেফিন * টিভির স্থিরতাবিনাশী সময়কে সরিয়ে গল্প-ফিকশনে ফিরলেন মাসউদুল হক * হাওড়ে হাওড়ে সরকার আমিনের তুমুল পঞ্চাশ * হিন্দি কবিতার অনুবাদে মজেছেন সাবেরা তাবাসসুম * অক্টোবরে দেশে ফিরছেন আহমাদ মাযহার, সঙ্গে মার্কিন মুল্লুকের টাটকা সব উপাখ্যান *  রচনাসমগ্রের ভূমিকা লিখছেন কাজল শাহনেওয়াজ * রঙ-তুলিকে কিছুটা বিশ্রামে দিয়ে কবিতা লেখার কলম তুলে নিলেন নাজিব তারেক * সাব্বির হাসান নাসির এবার সুফিসাহিত্যে নয়, ভ্রমণকাহিনিতে তুলে আনছেন ক’জন মহান মানব * চিত্রপ্রদর্শনী নয়, সামনে রাকীব হাসানের কাব্য-প্রকাশনা * মার্কেজের নীরবতার একশ’ বছরের সুবর্ণজয়ন্তী প্রকাশনা নিয়ে ব্যস্ত জিএইচ হাবীব *





শতবর্ষের নীরবতা
আকিল জামান ইনু
সেভিল, স্পেন। উনিশ শ’ বিরানব্বই। উদযাপিত হচ্ছে ওয়ান হানড্রেড ইয়ারস অব সলিচিউড-এর প্রকাশনার পঁচিশতম বার্ষিকী। ব্যানারের ওপরে লেখকের ছবি। নিচে দুই ব্যক্তি একজন অপরজনকে জিজ্ঞেস করছেন; ছবির মুখটা কার? ‘দ্বিতীয় ব্যক্তির উত্তর, ‘উনি কলম্বিয়ার এক একনায়ক। গত পঁচিশ বছর ধরে ক্ষমতায় আছেন!’ পাঠক ভেবে দেখতে পারেন দু’হাজার সতেরোতে যখন সারাবিশ্বে পালিত হচ্ছে গ্রন্থটি প্রকাশনার পঞ্চাশতম বর্ষ। ব্যানারটি কেমন হতে পারে? উপরে লেখকের মুখ। নিচে এক ব্যক্তি জানতে চাইছেন, ‘ছবির মানুষটি কে?’ অপরজনের উত্তর, ‘আপনি জানেন না! উনি বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম একনায়ক। যিনি একাহাতে একটি জনগোষ্ঠীর সাহিত্যকে নিয়ে গেছেন অন্য উচ্চতায়; আর হাতের মুঠোয় ধরে রেখেছেন বিশ্বজুড়ে লাখো-কোটি ভক্তের হৃদয়।’ উনি আর কেউ নন গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস। ভক্তদের প্রিয় গ্যাবো। যার ‘ওয়ান হানড্রেড ইর্য়াস অব সলিচিউড’ প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে বদলে দিয়েছে ল্যাটিন আমেরিকান সাহিত্যের খোলনলচে। শুধু কি তাই? ২০১৪তে গ্যাবোর মৃত্যুর পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এই গ্রন্থ নিয়ে বলেন। ‘এটি সেই বই যা কেবল ল্যাটিন আমেরিকান সাহিত্যকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেনি বরং বদলে দিয়েছে সাহিত্যের ভাষা ও সময়।’ তার স্বদেশ কলম্বিয়ার রাষ্ট্রপতি তাকে স্মরণ করেন এভাবে, ‘তার লেখনী আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু তার চাইতে বড় কথা তিনি চিরকাল বেঁচে থাকবেন বিশ্বজুড়ে মানবিক আশার প্রতীক হয়ে।’ সেই ১৯৬৭ থেকে ২০০৪-এ প্রকাশিত তার সর্বশেষ উপন্যাস ‘মেমোরিজ অব মাই মেল্যান্কলি হোরস’ দিয়ে শাসন করেছেন বিশ্বসাহিত্য। সঙ্গে ছোট গল্প তো আছেই। কে প্রভাবিত হয়নি তার লেখনীতে? সমসাময়িকেরা তো বটেই, হালের টনি মরিসন, সালমান রুশদী, হুনট দিয়াজ সবার অনুপ্রেরণার উৎস তিনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রকাশিত কোন উপন্যাস বিশ্বসাহিত্যকে এতটা প্রভাবিত করেনি; যতটা করেছেন মার্কেস তারÑ ‘ওয়ান হানড্রেড ইর্য়াস অব সলিচিউড’ দিয়ে। এ গ্রন্থের ম্যাজিক্যাল রিয়ালিস্ট স্টাইল যা প্রভাবিত মডার্নিজম ও কিউবান ভ্যানগাডির্য়া সাহিত্য আন্দোলন দ্বারা। বিকশিত করেছে সাহিত্যে ল্যাটিন আমেরিকান বুম সেই ১৯৬০-৭০ দশকে। আর প্রিয় বন্ধু ফিদেল ও গ্যাবো হয়ে উঠেছেন সারা বিশ্বে ল্যাটিন আমেরিকার প্রতীক।

প্রাক কথন :
শুরুটা সহজ ছিল না। বিষাদময় চেক কাফকায় আছন্ন মার্কেস। ত্যাগ করেছেন আইন পাঠ। কার্টাজেনা শহরে উপস্থিত। উদ্দেশ্য সাংবাদিকতা। বুকের গভীরে লালিত স্বপ্ন লেখক হবেন। শেকড় ছেঁড়া জীবন। অর্থাভাবে ভাড়া নিয়েছেন গনিকালয়ের কক্ষ। পতিতাদের চিঠিপত্র লিখে দেন বিনিময়ে তারা করে দেয় তার গৃহস্থালির কাজ। কলাম লিখে যা পান দিন চলে না। ধারদেনা নিত্যসঙ্গী। অবসরে তুমুল আড্ডা। পছন্দ না হলেও বোগোটাতে সিনেমা রিভিউ লেখা। এভাবেই কাটছিল দিন। ১৯৫০। ২৩ বছর বয়সী মার্কেসের সামনে উপস্থিত তার মা। প্রথমে চিনতে পারেননি মাকে। মায়ের প্রস্তাব পৈত্রিক বাড়ি বিক্রি করতে মার্কোসকে যেতে হবে। পরদিন যাত্রা মায়ের সঙ্গে । বারকানিয়া থেকে আরকাতাকা। যাত্রাপথে ট্রেন থামল এক জনশূন্য স্টেশনে। কিছুটা পথ পেরিয়ে একটি সাইনবোর্ড ‘মাকনডো’। সাহিত্যবিধাতা বুঝি মিটিমিটি হাসছিলেন তখন। কারণ এই ‘মাকনডো’ আর ১৭ বছর পর আত্মপ্রকাশ করবে বিশ্বসাহিত্যের এক অনন্য গন্তব্য হয়ে। বাড়ি বিক্রি হয়নি। কিন্তু বুকে করে বয়ে এনেছেন পিতৃপুরুষের বাসস্থানের এক নতুন সুঘ্রাণ। স্মৃতিতে কেবল একটি রেখা। যে রেখা পেরুতে পারলে হয়ত তিনি খুঁজে পাবেন তার গন্তব্য। তা তিনি পেরিয়েছিলেন। কেবল সময় লেগেছে ১৭ বছর। জান্তা সরকার চেপে বসছে। মার্কেস পাড়ি দিলেন ইউরোপে। কঠিন সময় পিছু ছাড়ে না। প্যারিস ছেড়ে রোমে সেখানে চলচ্চিত্র নিয়ে শিক্ষকতা। শিহরিত হয়েছেন লন্ডনে। প্রত্যাখ্যাত জার্মানি, চেকোসেøাভাকিয়া আর সোভিয়েত ইউনিয়নে। আবার ফিরে এলেন দক্ষিণে। ভেনিজুয়েলা, মিলিটারি পুলিশের হাতে গ্রেফতার হতে হতে বেঁচে যাওয়া। ফিদেল ক্যাস্ট্রো ক্ষমতা গ্রহণের পর যোগ দিলেন প্রেন্সাা ল্যাটিনায়। নতুন বিপ্লবী সরকারের প্রেস এজেন্সি
 গন্তব্য এবার নিউইয়র্ক। ১৯৬১তে পা দিলেন নিউইয়র্কে। সঙ্গে স্ত্রী মার্সেদিস, পুত্র রডরিগো। ঠাঁই নিলেন ওয়েবস্টার হোটেলে। বেশিরভাগ সময় কাটত রকফোলার সেন্টারের পার্শ্বস্থ প্রেস অফিসে। সর্বক্ষণ প্রস্তুত থাকতেন লোহার রড নিয়ে কিউবান শরণার্থীদের আক্রমণ ঠেকাতে। অবিরাম হুমকি টেলিফোনে । কট্টরপন্থীরা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়ায় প্রেন্সা ল্যাটিনা ত্যাগ। এবারের গন্তব্য মেক্সিকো সিটি। মনোযোগ ফিকশনে। তবে তার আগে পরিচিত হতে চান ফকনারের বর্ণিত পশ্চিমের সঙ্গে। গ্রে-হাউন্ড বাসে ব্যাপক ভ্রমণ। তিক্ত অভিজ্ঞতার ঝুড়ি অর্জন। তবু ভ্রমণ শেষে তার ভাষায় ‘and it was true as human as in the novels of the old master’। অন্ন সংস্থানে ব্যস্ত মার্কেস এর মাঝেও লিখেছেন লিফ স্টর্ম, ইন ইভিল আওয়ার, নো ওয়ান রাইটস টু দ্য কর্নেল ও বিগ মামাস ফিউনারেল। কিন্তু ভাগ্যদেবী প্রসন্ন হয়নি। মেক্সিকো সিটিতে নতুন করে ভাগ্য পরীক্ষা। সেখানেও ভুগেছেন বিস্তর। চিত্রনাট্য রচনা। মহিলা বিষয়ক ম্যাগাজিন ‘লা ফ্যামিলিয়া’ ও অপর একটি ক্রাইম স্ক্যান্ডাল ম্যাগাজিন সম্পাদনা। কপি করেছেন জে. ওয়ালটার থমসনের রচনার। এর মাঝে ভাগ্য পরিবর্তনের আভাস। তার নতুন এজেন্ট ব্যালসেলস খুঁজে পেয়েছেন মার্কিন প্রকাশক। হারপার এন্ড রো। তার চারটি উপন্যাসের ইংরেজী স্বত্ব ক্রয়ে আগ্রহী। বিনিময়ে মার্কেস পাবেন এক হাজার ডলার। মার্কেসের ভাষায়,  ‘This contract is a piece of shit.’ তবুও তাতে স্বাক্ষর করেন। সেটি ১৯৬৫। এত কিছুর মাঝেও এক দিনের জন্য তাকে ছেড়ে যায়নি মাকনডো। প্রতিটি দিন তিনি অতিক্রম করার চেষ্টা করেছেন সেই রেখা, যে রেখার ওপারে আছে এক অপার্থিব বাস্তবতা। যা তার বোধকে আলোড়িত করেও অধরা। যা তাকে হাজারো লোকের ভিড়েও করেছে একা। সেই ১৯৫০ থেকে তার প্রতিটি মুহূর্ত যন্ত্রকাতর। বোধের গভীরে দোলা দেয় মাকানডো। কিছু শব্দ, রেখা, চরিত্র। অন্তরে নিঃসঙ্গ মার্কেস। ব্যাকুল সংশয়। সাহিত্য দেবী তখনও বোধকরি হাসছিলেন। সময় ঘনিয়ে আসছে। সৃষ্টি উন্মোচিত হবে। জন্ম নেবেন বিশ্বসাহিত্যে নতুন স্রষ্টা গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস। হারপার এ্যান্ড রোর সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের পর মার্কেস সপরিবারে তার প্রিয় ওপেল ১৯৬২তে চরে ছুটি কাটাতে বেরিয়েছেন। গন্তব্য অ্যাকাপুলক। একদিনের যাত্রাপথ। পথিমধ্যে ধীর হতে হতে থেমে যায় গাড়ি। পরবর্তী রচনা আলোর ঝলকের মতো ভিড় করে আসে তার মনে। প্রায় দু’দশক ধরে ছোট এক গ্রামে বৃহৎ পরিবারের যে সূত্র সন্ধানে ছিলেন মার্কেস তা তিনি পেয়ে গেছেন। এক মুহূর্তে তার চোখের সামনে বিস্তৃত ফায়ারিং স্কোয়াডে দাঁড়ানো একজনের সমগ্র অতীত। বিষয়টি স্মরণ করতে গিয়ে পরবর্তীতে তিনি বলেন, ‘It was so ripe in me that i could have dictated the first chapter, word by word, to a typist.’। ফিরে এলেন তার স্টাডিতে। পরবর্তী আঠারো মাস কেটেছে টাইপ রাইটার সামনে রেখে। শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে ‘মাকনডো’তে গড়ে তুলছেন এমন এক বাস্তবতা যা কখনও ছিল না, আগামীও কখনও দেখবে না। সংসারের হাল ধরেছেন মার্সেদিস। একের পর এক গৃহস্থালি সামগ্রী বিক্রি করেও চলছে না দিন। ধারদেনা বাড়ছে। বন্ধুরা সাহায্যের হাত বাড়িয়েছেন। শেষ পর্যন্ত ত্যাগ করলেন প্রিয় ওপেলের মায়াও । ঠিক আঠারো মাসে তিনি মুছে দিলেন কল্পনা আর বাস্তবতার সীমারেখা। এই আঠারো মাসে সিগারেট টেনেছেন ৩০ হাজার। ধার হয়েছে ১০ হাজার ডলার। স্ত্রীর প্রশ্ন ‘ÔAnd what if, after all this, it’s a bad novel?’ মার্কেস যতি টেনেছেন লেখার। পোস্ট অফিসে উপস্থিত প্রকাশনা সংস্থায় পা-ুলিপি পাঠাবেন। প্রয়োজনীয় ৮২ পেসো ছিল না। অগত্যা দু’ভাগে ভাগ করে পাঠাতে হলো দু’বারে। এই আঠারো মাসে বিলাস সামগ্রী বলতে রক্ষা পেয়েছে কেবল টেপ-রেকর্ডারটি। মার্কেস যে সঙ্গীত ছাড়া লিখতে পারেন না! স্বপ্ন ছিল, কিন্তু খুব বেশি প্রত্যাশার সাহস যোগায়নি অতীত। লেখকের মনে দোলা দেয় বিখ্যাত প্রকাশক আলফ্রেড এ নফের উক্তি, ‘অনেক রচনা প্রকাশের দিনেই মৃত্যু বরণ করে।’ দুটি প্রকাশনা সংস্থার অস্বীকৃতির পর সুদ আমেরিকানা ছাপতে রাজি হয় মাকের্সের বিশাল জটিল উপন্যাস ‘সায়েন আনিওস দি সোলিদেদ।’ প্রথম আট হাজার কপি নিঃশেষ প্রকাশের প্রথম সপ্তাহে। গনিকা থেকে অধ্যাপক সবাই বরণ করে নিয়েছেন বিশ্বসাহিত্যের এ নতুন সম্রাটকে। অভিনন্দনের জোয়ার বইছে। পাবলো নেরুদা কেবল অভিনন্দন জানিয়ে ক্ষান্ত নন কবিতা লিখেছেন তাকে নিয়ে। দি গ্রীন হাউজের রচয়িতা মারিও ভারগাস যোসা উপস্থাপন করেছেন গবেষণাপত্র। এ গ্রন্থ একীভূত করেছে স্পেন আর ল্যাটিন আমেরিকার সাহিত্যকে। মুছে দিয়েছে দীর্ঘদিনের বিভক্তি। হারপার এ্যান্ড রোর চীফ এডিটর ক্যাস কেনফিল্ড রাজি হলেন বইটির ইংরেজী অনুবাদের জন্য ব্যালসেলস এজেন্সিকে ৫ হাজার ডলার প্রদানে, তবে কিস্তিতে। মার্কেস বন্ধু জুলিও করটোজার প্রস্তাবনা মোতাবেক অনুবাদের দায়িত্ব দিলেন গ্রেগরি রাবাসাকে। ১৯৬৯ হাম্পটন বে। লং আইল্যান্ডের বাড়িতে রাবাসা শুরু করলেন অনুবাদের কাজ। ১৯৭০। মার্চে প্রকাশিত হলো ‘ওয়ান হানড্রেড ইর্য়াস অব সলিটিউড’-এর ইংরেজী অনুবাদ। টাইমসে জন লিওনার্দ লিখলেন- ‘With a single bound, Gabriel Garcia Marquez leaps on to the Stage with Gunter Grass and Vladimir Nabokov, his appetite as enormous as his imagination.’ রাবাসার অনুবাদ পড়ে মার্কেস নিজেই বলেন, ‘তার মূল রচনার চেয়ে উৎকৃষ্ট’। তিনি রাবাসাকে অভিহিত করেন, ‘The best Latin American writer in English Language.’  সেই থেকে আজ পর্যন্ত ৪৪টি ভাষায় অনূদিত হয়ে ৫০ মিলিয়ন কপি বিক্রি হয়েছে বইটির। কি লিখেছেন তিনি? এক কথায় ‘ম্যাজিক রিয়েলিজম।’ শিল্পের আঘাতে ভেঙ্গে দিয়েছেন প্রকৃতির নিয়ম। তার উপন্যাসের জাদু এই যে, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তিনি পাঠককে টেনে রাখেন বুয়েন্দিয়াস ও পার্শ্ব চরিত্রের মাঝে। পাঠক ভাবতে বাধ্য- তারা জীবন্ত; এমন হতেই পারে! মুছে দিয়েছেন বাস্তবতা আর কল্পনার সীমারেখা। ‘ম্যাজিক রিয়েলিজম’ প্রথম উচ্চারিত হয় জার্মান শিল্প সমালোচক ফ্রাঞ্জ রোহ এর লেখনীতে ১৯২৫-এ। আর মার্কেস তা ব্যবহার করে মিলিয়ে ফেলেন মিথ আর ইতিহাস। যেখানে মিথবাহিত ইতিহাস পৌঁছে যায় তার পাঠকের কাছে। সত্য উঠে আসে ভাষা আর মিথ হয়ে। সত্য আর কল্পনা আলাদা করা দুষ্কর। সব কিছুর পর আছে বিচ্ছিন্নতা, আছে নিঃসঙ্গতা।
ওয়ান হানড্রেড ইর্য়াস অব সলিটিউড ও ল্যাটিন আমেরিকার সাহিত্য :
ভারগাস যোসা নোবেল জয়ী ও মার্কেসের অন্যতম বন্ধু। চার দশক ধরে মুখে কুলুপ এঁটে ছিলেন বইটি নিয়ে। একেবারে স্পিকটি নট। তার ভাষায় দুই বন্ধু চুক্তি করেছেন যে, তাদের নিজেদের গল্প তারা নিয়ে যাবেন কবরে। তিনিও বাধ্য হন মুখ খুলতে। পরিষ্কার বলেন তার হৃদয়ের কতটা জুড়ে আছেন মার্কেস। আর সায়েন আনিওস দে সোলেদাদ নিয়ে বলেন, ‘এটি সেই বই যা সাধারণ মানুষ থেকে বুদ্ধিজীবী, ছুঁয়ে গেছে সবাইকে। বৃদ্ধি করেছে স্প্যানিশ সাহিত্যের পাঠক। লেখনীর ধরন পরিষ্কার ও স্বচ্ছ। একই সঙ্গে এই বই প্রতিনিধিত্ব করে ল্যাটিন আমেরিকার জনযুদ্ধ, অসাম্য, স্বপ্ন, তাদের সঙ্গীত, প্রেম, বর্ণ। আর এসবই এই বইয়ে উঠে এসেছে কল্পনা আর বাস্তবতার নিখুঁত মিশেলে। বইটির ২৫তম প্রকাশনী বার্ষিকীতে আন্তর্জাতিক লেখক কমিশন জার্নাল ওয়াসাফিরিতে এক জরিপের ফলাফলে জানায়, গত ২৫ বছরে বিশ্ব সাহিত্যকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছে এই বই। নোবেল জয়ী পাবলো নেরুদার ভাষায়Ñ ‘The greatest revelation in spanish language since Don Quixote of Cerventas’ তার পরও সাহিত্যে ল্যাটিন আমেরিকানো বুমের সূত্রপাত এ গ্রন্থের মাধ্যমে এ কথা বললে ভুল বলা হবে। বরং এভাবে বলাই ন্যায়সঙ্গত, এ গ্রন্থের প্রকাশ এমন এক সময়ে যখন ল্যাটিন আমেরিকার সাহিত্য আন্দোলন চূঁড়ায়। ১৯৬১তেই আধুনিক হোমার প্রায় অন্ধ আর্জেটাইন লেখক জর্জি লুইস বোর্গেস বিশ্বভ্রমণ করেছেন সেলিব্রেটির তকমা নিয়ে। তাকে অনুসরণ করে উঠে আসছেন জোসে ডনসো, করটাজার, ভারগাস যোসা, ফুয়েন্তেস। ল্যাটিন আমেরিকানো বুমের চূড়ান্ত বিজয় ঘোষিত হয় ১৯৬৭তে যখন মিগুয়েল এ্যাঞ্জেল অস্টুরিয়াস মনোনীত হলেন নোবেলের জন্য। ঠিক সে বছরই প্রকাশিত হয় মার্কেসের ‘সায়েন আনিওস দে সোলিদেদ’। গ্রন্থটি প্রকাশের জন্য এর চেয়ে উৎকৃষ্ট সময় আর হতে পারত না। চূড়ায় পৌঁছানোর অন্তত এক দশক পূর্ব থেকেই ল্যাটিন আমেরিকান সাহিত্য আন্দোলন নজর করছিল বিশ্বজুড়ে সাহিত্যানুরাগীদের। সেই ১৯২০ থেকে। তরুণ অস্টুরিয়াস, জোসে মারিয়া একই সঙ্গে লিখে আসছিলেন স্প্যানিশ ও কুয়েচা ভাষায়। ১৯৫০ ও ৬০ দশকে লেখকরা বেছে নেন সোশ্যাল রিয়েলিজম ধারা। যার নেতৃত্বে ছিলেন ক্যামিলো যোসে সেলা ও মিগুয়েল ডেলিবেস। ল্যাটিন আমেরিকান যারা ক্যারিয়ার গড়ে তুলতে চাইছিলেন স্পেনে তারা বেছে নেন সোশ্যাল রিয়েলিস্ট স্টাইল। যার অন্যতম মাদ্রিদে বসবাসরত ভারগাস যোসা। ওদিকে ল্যাটিন আমেরিকান সাহিত্যিকরা আন্তর্জাতিকভাবে ফরাসী উপন্যাসের নতুন ধারা, যা ‘নিউ নভেল’ নামে খ্যাত তার মুখোমুখি হচ্ছিলেন। যে ধারার অন্যতম সমর্থক জ্য পল সাত্রে একে অভিহিত করেন ‘এন্টি নভেল’ নামে। সে দল তখন ন্যারেটিভ স্টোরিটেলিং থেকে বেরিয়ে এসে নতুন গবেষণায় নিয়োজিত। এ ধরনের গবেষণার উৎকৃষ্ট উদাহরণ হলো জর্জ পেরেসের ১৯৬৯-এ প্রকাশিত অ ঠড়রফ । যেখানে তিনি বর্জন করেন ফরাসী ভাষায় বহুল ব্যবহৃত ‘ই’ শব্দটি। সে রকম এক পরিস্থিতিতে বইয়ের বাজার সম্পূর্ণ প্রস্তুত মার্কেসকে বরণ করে নেয়ার জন্য। যিনি পাল্টে দেবেন সাহিত্যের সব প্রচলিত ধারা। বেরিয়ে আসবেন সব ফর্ম ভেঙে। ১৯৬৭ থেকে ৬৯ সমালোচকেরা এক বাক্যে স্বীকার করে নেন মার্কেস পুরনো ধারাগুলোর সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছেন। এ্যাঞ্জেল রামার মতে এটি এক কসমোপলিটন গল্প। তার ভাষায়, ‘Could correct the path of the modern novel.’ নিঃসন্দেহে তার উপন্যাসে মার্কেস বিশুদ্ধবাদী।  ইতালিয়ান লেখক ন্যাটালিয়া গিনজবার্গ বলেন, ‘এ এক জীবন্ত উপন্যাস’। ফ্রানসাইন গ্রোজ ২০১৩তে স্বীকার করেন যে, এই উপন্যাস তাকে হার্ভার্ড ছাড়তে বাধ্য করে। ইয়েল লিটেরারি স্কলার হ্যারল্ড ব্লুমের মতে, ‘ঞযব হবি উড়হ ছঁরীড়ঃব.’ প্রকাশের পর থেকে সব সমালোচকই এক বাক্যে মেনে নেন এ গ্রন্থ ম্যাজিক্যাল রিয়েলিজমের সেরা উদাহরণ। পাশাপাশি তকমা জোটে ‘কল্পনা আর বাস্তবতার এক অদ্ভুত মিশেল’, ‘বাস্তববাদী কিন্তু কল্পনায় ভরপুর’, ‘মিথিক্যাল রিয়েলিজমের অনন্য উদাহরণ,’ ‘সুপ্রাররিয়েলিজম’ আর লা-মঁদ-এর ভাষায় ‘ঞযব সধৎাবষড়ঁং ংুসনড়ষরপ.’ হার্ভার্ড স্কলার রবার্ট কিয়েলির মতে এ গ্রন্থ ‘অ্যা সাউথ আমেরিকান জেনেসিস।’ সবচেয়ে প্রণিধানযোগ্য বোধকরি উইলিয়াম কেনেডি। ন্যাশনাল অবজারভারে  লেখেন ‘The first piece of literature since the Book of Genesis that should be required reading for the entire human race.’ তবে সবই যে প্রশংসা তা নয়। সমালোচনাও ছিল। সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয় ব্যালজাকের ‘দ্য কোয়েস্ট অব এ্যাবসলিউটের’ সঙ্গে কিছু সাদৃশ্য। ওক্টাভিও পাজের ভাষায় এ গ্রন্থ ‘Watery poetry’। ইংরেজ লেখক এন্থনি বার্গেস তার উপরে ঠাঁই দিয়েছেন বার্গেস ও নাবোকভকে। এমনকি প্রভাবশালী স্পেনীয় প্রকাশক ক্যারলস ব্যারোল একে প্রকাশের উপযোগী গ্রন্থ মনে করেননি। তবে বিরূপ সমালোচনা  গ্রন্থের গুরুত্বকে বিন্দুমাত্র হ্রাস করেনি। বরং একে আরও বেশি করে নিয়ে এসেছে পাঠকের আগ্রহের কেন্দ্রে। সব মিলিয়ে এই গ্রন্থ প্রকাশের পর থেকে ল্যাটিন আমেরিকান সাহিত্যের নেতৃত্ব চলে আসে মার্কেসের হাতে। যে পথ খুঁজে ফিরছিলেন অনেকেই, মার্কেস তা আবিষ্কার করেন। চিনিয়ে দেন অন্যদের। এখানেই তার মাহাত্ম্য।
   সেই ১৯৫০-এ এক তরুণের মনে গেঁথে গিয়েছিল একটি শব্দ, একটি নাম- মাকনডো। বয়ে বেড়িয়েছেন বুকের ভেতর। নিঃসঙ্গ, একাকী। সতেরো বছর পর যাকে তিনি পরিণত করেন বিশ্বসাহিত্যের এক অনন্য গন্তব্যে। নোবেল মঞ্চে দাড়িয়ে বলেন,‘A reality not of paper, but one that lives within us and determines each instant of our countless daily deaths, and that nourishes a source of insatiable creativity, full of sorrow and beauty, of which this roving and nostalgic Colombian is but one cipher more, singled out by fortune. Poets and beggars, musicians and prophets, warriors and scoundrels, all creatures of that unbridled reality, we have had to ask but little of imagination, for our crucial problem has been a lack of conventional means to render our lives believable. This, my friends, is the crux of our solitude.’

প্রথম প্রকাশের ক্ষণে মনে ছিল ভয়। বিখ্যাত প্রকাশক আলফ্রেড এ নফের সেই উক্তি ‘কিছু বই প্রকাশের দিনই মরে যায়’। না। কোন কারণ ছিল না ভয়ের । সায়েন আনিওস দে সলিদাদ প্রকাশের দিনই এর স্রষ্টা গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস অর্জন করেছেন অমরত্ব।