করোনাকাল
বিচ্ছিন্ন অনুভব
মাহফুজা হিলালী

প্রবন্ধ
অধ্যাপক আনিসুজ্জামান
শামসুজ্জামান খান

গল্প
ডায়মন্ড লেডি ও পাথর মানব
হামিদ কায়সার

গদ্য
নিদ্রা হরণ করেছিল যে বই
মিনার মনসুর

নিবন্ধ
পঞ্চকবির আসর
সায়কা শর্মিন

বিশ্বসাহিত্য
আইজাক আসিমভের সায়েন্স ফিকশন
অনুবাদ: সোহরাব সুমন

বিশেষ রচনা
প্রথম মহাকাব্যনায়ক গিলগামেশ
কামাল রাহমান

শ্রদ্ধাঞ্জলি
মুজিব জন্মশতবর্ষ
মারুফ রায়হান
 
সাক্ষাৎকার
কথাশিল্পী শওকত আলী

জীবনকথা
রাকীব হাসান

ভ্রমণ
ইম্ফলের দিনরাত্রি
হামিদ কায়সার

ইশতিয়াক আলম
শার্লক হোমস মিউজিয়াম

নিউইর্কের দিনলিপি
আহমাদ মাযহার

শিল্পকলা
রঙের সংগীত, মোমোর মাতিস
ইফতেখারুল ইসলাম

বইমেলার কড়চা
কামরুল হাসান

নাজিম হিকমাতের কবিতা
ভাবানুবাদ: খন্দকার ওমর আনোয়ার

উপন্যাস
আলথুসার
মাসরুর আরেফিন

এবং
কবিতা: করেনাদিনের চরণ

১৪ বর্ষ সংখ্যা ০১
আগস্ট ২০২১

লেখক-সংবাদ :





রঙের সঙ্গীত, মোমার মাতিস
ইফতেখারুল ইসলাম
সম্প্রতি নিউ ইয়র্কের মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্টের একটি বিখ্যাত ছবি নিয়ে দৈনিক কালের কন্ঠ পত্রিকায় আমার একটি লেখা প্রকাশিত হয়। ফেইসবুকের কারণেই মননশীল লেখক ও গবেষক আহমাদ মাযহার আমার লেখাটি দেখেন । তিনি তাঁর মন্তব্যে জানিয়েছেন, নিউ ইয়র্কে বসবাসের সুবাদে ওই ছবিটি তিনি কদিন পরপরই দেখতে যান। এটা বিরল এক সৌভাগ্যের বিষয় । সুতরাং তাঁর সৌভাগ্যে একটু ঈর্ষান্বিত বোধ করি । আমি চিরকাল দেশে স্থায়ীভাবে বাস করা মানুষ । আগে কর্মসূত্রে বারবার বিদেশে গিয়েছি । এখন সে সুযোগ কম । দীর্ঘদিনের ব্যবধানে আবার কখনও ওসব শহরে গেলে কিছু বিখ্যাত ও প্রিয় মিউজিয়াম দেখতে যাই । আর মাঝে মাঝে ঈর্ষা করি সেইসব মানুষকে যাঁরা প্যারিস, নিউ ইয়র্ক অথবা বস্টনে থাকেন । যে-কোনো দিন অনেকখানি সময় নিয়ে দেখে আসতে পারেন চিত্রকলার বড় কোনো সংগ্রহ অথবা প্রিয় কোনো শিল্পীর বিখ্যাত একটা ছবি ।
প্যারিস, নিউ ইয়র্ক অথবা লন্ডনের মতো মহানগরগুলো অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কারণেই পৃথিবী-বিখ্যাত । তার পরেও পর্যটকদের মধ্যে একটা ছোট কিন্তু উল্লেখযোগ্য অংশ সাহিত্য, শিল্প ও সংস্কৃতির কারণে এসব শহরের প্রতি আকৃষ্ট হন । এরকম বহু মানুষের কাছে প্যারিস মানেই ল্যুভ, দ’ওরসে, ল’অরেন্জারি অথবা মুজি মোনে মারমোতাঁ । নিউ ইয়র্ক মানে মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অব আর্ট বা মেট আর মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্ট বা মোমা । তাঁদের কাছে ভূমধ্যসাগর তীরের নিস শুধু পর্যটন-কেন্দ্র নয় । শহরটির গুরুত্ব রেনোয়া, মার্ক শাগাল এবং মাতিস মিউজিয়ামের জন্য ।
নিসে যখন যাই তখন আমার বেশি আগ্রহ মাতিসের ব্যাপারে যিনি ইমপ্রেশনিস্ট চিত্রকলার স্বর্ণযুগে ছবি আঁকতে শুরু করেছেন । অনেক বড় শিল্পীর সমসাময়িক হয়েও নিজের জন্য খুঁজে পেয়েছেন একটা আলাদা পরিচয় । জন পিটার রাসেল নামের এক শিল্পীর মাধ্যমে তিনি ইমপ্রেশনিস্ট চিত্রকলার সঙ্গে পরিচিত হন । পরিচিত হন তখন পর্যন্ত অল্প-চেনা শিল্পী ভ্যান গগের চিত্রকর্মের সঙ্গে । এ পর্যায়ে এসে মাতিসের ছবি আঁকার স্টাইল, রীতি-পদ্ধতি আমূল বদলে যায় । তিনি নিজেই বলেছেন, জন তাঁর শিক্ষক; এই শিক্ষক তাঁকে শিখিয়েছেন রঙের সব নিয়ম-কানুন । পরে তিনি যুক্ত হয়েছেন ফভিজম-এর শিল্প-আন্দোলনে । আর বিয়ের আগে তাঁর প্রেয়সীকে লিখেছিলেন, ‘...তোমাকে আমি গভীরভাবে ভালোবাসি । তবে আমি চিরকাল বেশি ভালোবাসবো
চিত্রকলাকে ।’
এই মাতিসের সন্ধানে এক সময় ভূমধ্যসাগর তীরের সৌন্দর্য পেছনে রেখে আমি নিস শহরের ভিতরে ঘুরে বেড়িয়েছি । সমুদ্রতীর থেকে উল্টোদিকে বেশ খানিকটা পথ বাসে করে যেতে হয় । তারপর ছোট পাহাড়ের মতো উঁচু জায়গা । সেখানে বিশাল উদ্যানের মাঝখানে সপ্তদশ শতাব্দীর এক চমত্কার প্রাসাদ । প্রাসাদের চারপাশে অসংখ্য বড় গাছ। জলপাই, সাইপ্রেস আর কেবব গাছের ছায়া। ওই প্রাচীন প্রাসাদটিকে সারিয়ে নিয়ে সাজিয়ে গুছিয়ে তার ভিতরে স্থাপিত হয়েছে মাতিস মিউজিয়াম । কয়েকটি স্থায়ী প্রদর্শনীর ঘর, কয়েকটিতে অস্থায়ী প্রদর্শনী। ড্রইং সংরক্ষণের জন্য বিশেষভাবে তৈরি ঘর আছে । আছে অডিটরিয়াম আর রেফারেন্স বইয়ের গ্রন্থাগার। পুরনো প্রাসাদ আর তার নতুন ভবন মিলিয়ে সেখানে সংরক্ষিত আছে ৬৮টি পেইন্টিং ও পেপার কাটিং, ২৩৬টি ড্রইং, ২১৮টি খোদাইচিত্র আর ৫৭ ভাস্কর্য । আছে ১৪টি বই যেগুলো শিল্পী নিজের হাতে অলঙ্করণ করেছেন । এছাড়াও আছে মাতিসের ব্যাক্তিগত সংগ্রহের ২০০টি আলোকচিত্র আর ১৮৭টি জিনিস যেমন, স্ক্রিন প্রিন্ট, দেয়ালের সাজ, মাটির তৈরি জিনিস, রঙিন কাচের তৈরি জানালা এবং কাগজপত্র ইত্যাদি আছে । আঁরি মাতিস (১৮৬৯-১৯৫৪) তাঁর দীর্ঘ শিল্পীজীবনে বিভিন্ন সময়ে চিত্রকলা থেকে ড্রইং, ভাস্কর্য আর অন্যান্য শিল্প-মাধ্যমে বিচরণ করেছেন । এক পর্যায়ে তুলির বদলে হাতে তুলে নিয়েছেন কাঁচি। পরিণত বয়সে অসংখ্য পেপার কাটিং করেছেন । বেশির ভাগ কাজ করেছেন বড় আকারে । সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে আছে মাতিসের এরকম বহু শিল্পকর্ম।
প্রথম জীবনেই ছবি আঁকা শিখেছেন আর তার চর্চা করেছেন সুচারুভাবে । এরপর তিনি কবিতার একজন অনুরাগী পাঠক হয়ে ওঠেন । প্রতিদিন সকালবেলায় তুলি, পেন্সিল বা এচিং-এর সুঁচ হাতে নেবার আগে খানিকক্ষণ তিনি কবিতা পড়তেন । তিনি বলতেন কবিতা হলো অক্সিজেনের মতো । ভোরের নির্মল বাতাসে শ্বাস নেওয়ার মতোই কবিতা মানুষের শরীর-মনকে সতেজ করে । মাতিস যেসব বই অলঙ্করণ করেছেন সেগুলো গুণগ্রাহীদের মধ্যে, বিশেষ করে ফ্রান্সের সংস্কৃতিমনা পরিবারগুলোতে খুবই আদৃত হয়েছে। তাঁর প্রথম বই হলো ১৯৩২ সালে প্রকাশিত ‘পোয়েসিস’, যেখানে স্তেফান মালার্মের লেখার সঙ্গে স্থান পেয়েছে মাতিসের ছবি । এই ছবিগুলো পৌরাণিক কাহিনী থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে আঁকা ।
দক্ষিন ফ্রান্সের একটা ছোট শহরে মাতিসের ছবির মিউজিয়াম কেন ? আসলে ১৯২০ সাল থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রায় ২৪ বছর মাতিস বেশির ভাগ সময় কাটিয়েছেন দক্ষিন ফ্রান্সে, বিশেষত নিস শহরে । ওখানে থাকাকালে উজ্জ্বল রঙের হালকা আস্তরণে এঁকেছেন স্থানীয় প্রকৃতির নানা দৃশ্য । নিসের কাছেই কান শহর । একেবারে শেষ বয়সে এসে কান শহরের কাছাকাছি এলাকায় একটি চ্যাপেলের নকশি-সজ্জার দায়িত্ব পান তিনি । এ কাজ তিনি শেষ করেন ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৫১ সালের মধ্যে । শেষ জীবনের অনেকটা সময় তিনি শয্যাশায়ী ছিলেন । কাজ করেছেন হুইলচেয়ারে বসে । এ সময়টাতে তিনি রঙিন কাগজ কেটে কেটে তৈরি করেছেন নানা ধরনের নকশা । নিউ ইযর্ক এবং প্যারিসের বিভিন্ন মিউজিয়ামে মাতিসের ভালো ভালো ছবি আছে । নীল নগ্নিকা সিরিজের প্রথম কটি ছবি আছে প্যারিসের ওরসে মিউজিয়ামে । এখানে বলে রাখা ভালো যে এই বিখ্যাত নীল নগ্নিকা সিরিজের ছবিগুলো আমাদের দেশেও যথেষ্টপরিচিত । এরই একটি ছবি ব্যবহার করে কালাম মাহমুদ নির্মলেন্দু গুণের ‘কবিতা অমীমাংসিত রমণী’ কাব্যগ্রন্থের প্রচ্ছদ তৈরি করেছিলেন । আর তা থেকেই মাতিস সম্পর্কে আমার কৌতুহলের শুরু । আগেই জানা ছিল যে, ১৯১০-এর দশকে আঁকা মাতিসের বেশ কিছু ছবি আছে নিউ ইয়র্কের মোমাতে । এ বছর জুলাইয়ের শুরুতে আমি যখন মোমাতে যাই তখন বিশেষ মনোযোগ দিয়ে দেখার জন্য কয়েকজন শিল্পী নির্বাচন করে নিই । তাঁদের মধ্যে অন্যতম আঁরি মাতিস ।

মোমার গ্যালারিতে আঁরি মাতিসের যত শিল্পকর্ম আছে সেগুলোর প্রায় সবই ১৯১০-এর দশকে আঁকা । ইতোমধ্যে তিনি উত্তর-ইমপ্রেশনিস্ট শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত । রঙের ব্যবহার, তুলির স্ট্রোক, এবং শিল্পরীতিতে তিনি নানারকমের নতুনত্ব আনতে চেষ্টা করেছেন । শিল্প-আলোচনার জগতে স্বীকৃতি অর্জন করে নিজের খ্যাতি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছেন । উল্লেখযোগ্য আর্থিক সাফল্যও এসেছে । স্বাভাবিকভাবেই পরবর্তী দশটি বছর শিল্পীর জীবনের সবচেয়ে বেশি সৃষ্টিমুখর কাল । ইতিপূর্বে অর্জিত স্বীকৃতি, খ্যাতি ও আর্থিক সাফল্য সত্ত্বেও তাঁকে তখন কাটাতে হয়েছে সাবধানী সময় । প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপে বিরাজ করছে এক ধরনের কঠিন পরিস্থিতি । মাতিসের ছবিতেও তখন সাশ্রয়ী চেষ্টার চিহ্ন । তাঁর ছবির ক্ষেত্রভূমিটি হয়েছে চওড়া, সরল ও সমতল । তাঁর চিরাচরিত উজ্জ্বল রঙের প্যালেটের মধ্যে কালো একটা বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে । ইমপ্রেশনিস্ট-পরবর্তী যুগের নতুন গবেষণা ও শিল্পরীতিতে তাঁর আগ্রহের চিহ্ন আছে ১৯০৫ সালে আঁকা পয়েন্টিলিস্ট ছবি ‘ছাতা-হাতে তরুণী’-তে । তুলির ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ফোঁটা ব্যবহার করে তৈরি হয়েছে বড় একটি ছবি । এমনভাবে বিভিন্ন রং ও আলোছায়ার খেলা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে যে একটু দূরে দাঁড়িয়ে দেখলে দৃশ্যটি স্পষ্ট হয় । আর খুব কাছে গিয়ে দেখলে চোখে পড়ে শুধুই ছোট ছোট রঙের ফোঁটা যা এই পয়েন্টিলিস্ট ছবির বৈশিষ্ট্য । এ ধরনের ছবিতে ভ্যান গগের প্রভাব এড়িয়ে চলা ওই সময়ের যে-কোনো শিল্পীর জন্যই কঠিন । তবে পরের দশক-জুড়ে আঁকা ছবিতে তিনি সেই প্রভাব থেকে সম্পূর্ণই সরে এসেছেন । ১৯০৫-০৬ সালে আঁকা “ইন্টেরিয়র উইথ আ ইয়ং গার্ল” বা ‘পাঠরত বালিকা’ মাতিসের মেয়ে মার্গারিটের ছবি । ছবিটিতে ছোট ছোট ব্রাশ-স্ট্রোকে বহু রঙের সমন্বয় থাকলেও সেটা ভ্যান গগ অথবা তাঁর সমসাময়িক শৈলী থেকে সম্পূর্ণ আলাদা । বহু বর্ণের সমাবেশে যেন রঙের দাঙ্গা বেধেছে । মেয়েটির চুলে হলুদ, কমলা, বাদামী, ইত্যাদি যত রং ব্যবহার করা হয়েছে সেগুলো সংখ্যায় ও বৈচিত্রে ছবির সামনের দিকে সাজানো ফলগুলোর রঙের চেয়ে মোটেই কম নয় । দক্ষিণ ফ্রান্সের এক বন্দর-নগরীতে থাকাকালে তিনি এই ছবি এঁকেছেন । সেখানে আর এক শিল্পী বন্ধুর পাশাপাশি থেকে ছবি আঁকতে আঁকতেই মাতিস রঙের ব্যবহার শেখার একটা লক্ষ্যে পৌঁছাতে চেয়েছেন । ‘কীভাবে আমার রং গান গেয়ে উঠবে’ – এটা শেখাই ছিল তাঁর অভীষ্ট।

তাঁর এ সময়ের ছবিগুলোতে তিনি প্রথাগত সরলরৈখিক দৃষ্টিকোণ বাদ দিয়ে কয়েকটি কৌনিক রেখা, সমতল বর্ণবিভা আর স্থাপত্য গঠনশৈলীর সহায়তায় এক ধরনের গভীরতা আনতে চেয়েছেন । ‘লাল ষ্টুডিও’ ছবিটি তারই উদাহরণ । শিল্পীর নিজের স্টুডিও-র জিনিসপত্রে ঠাসা জটিল পরিবেশটিকে এখানে তিনি একটি সরল ও এক- রঙবিশিষ্ট আয়তক্ষেত্র হিসেবে উপস্থাপন করেছেন । নিজের আঁকা ছবি, সিরামিকের কাজ, ভাস্কর্য, ইত্যাদি সবকিছুকে এই ছবিতে স্থান দিয়েছেন তিনি ।

ঘরের স্থাপত্যশৈলী, আসবাবপত্র ও অন্য সবকিছু খুব সরলভাবে কয়েকটি সাদা রেখার মধ্য দিয়ে উপস্থাপিত হয়েছে । তার মধ্যেই ছড়িয়ে আছে কয়েকটি শিল্পকর্মের প্রতিকৃতি । আর ছবির ভিতরে বাম দিকের নিচের অংশে যে সিরামিকের কাজটির প্রতিকৃতি দেখা যাচ্ছে সেই মূল সিরামিক পাত্রটি কিন্তু মাতিসের বিখ্যাত শিল্পকর্ম । আর সেটা প্রদর্শিত হচ্ছে মোমার এই ঘরে ‘লাল ষ্টুডিও’ ছবির ঠিক সামনেই । ‘পিয়ানো-লেসন’ ছবিটিতে আছে গভীর রেখা দিয়ে বেষ্টন করা রং । এই রঙের সাহায্যেই তিনি ঘরের ভেতরকার নানা বস্তুর আকৃতি ফুটিয়ে তুলেছেন । এই ছবির ছেলেটিকে খুব ছোট মনে হয় । আসলে এটি মাতিসের ষোলো বছরের ছেলে পিয়ের । এসব ছবি ছাড়াও এই কালপর্বটিতে মাতিস অনেকগুলো ভাস্কর্য-নির্মাণের কাজ
করেছেন ।
১৯০৯ সালে আঁকা ‘নৃত্য’ নামের ছবিটি বেশ বড়। নীল আকাশের পটভূমি আর পায়ের কাছে অনেকখানি সবুজ রঙের ভূমি । তার উপর নৃত্যরতা পাঁচ নারীর গতিময় দেহভঙ্গিমা । সবাই হাত ধরাধরি করে আছে । পায়ের ভঙ্গিতে চলমানতার চিহ্ন । পটভূমির নীল ও সবুজের মধ্যে বিস্তারিত কিছু নেই যা থেকে স্থান-কাল বিষয়ে কোনো ধারণা করা যাবে ।
ওই বছরের মার্চ মাসে সের্গেই শুকিন নামের এক রাশান বণিক মাতিসকে দুটি ছবি আঁকার দায়িত্ব অর্পণ করেন । ‘নৃত্য’ ও ‘সঙ্গীত’ নামের এই ছবি দুটি এখন সেন্ট পিটার্সবার্গের হার্মিটেজ মিউজিয়ামে প্রদর্শিত হয় । মূল ছবির কাজ শুরু করার আগে ‘নৃত্য’ ছবিটির একটি কম্পোজিশনাল স্টাডি দ্রুত তৈরি করেন মাতিস । সাত দিনের মধ্যে এঁকে শেষ করা সেই ছবিটিই মোমার সংগ্রহে রাখা এই ছবি । এই স্টাডিটিকে কোনো একটি সিঁড়ির ল্যান্ডিং-এ রাখবার পরিকল্পনা ছিল । সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় ছবিটির ডানদিকের নিচের অংশটি প্রথম চোখে পড়বে । সম্ভবত সে কারণেই ডানদিকের নারীর দেহটি ছবির উপর অনেকখানি ঝুঁকে আছে যাতে গতির ধারনাটি প্রানবন্ত হয়ে ওঠে । আর বাঁ দিকের চরিত্রটি অন্যদের তুলনায় অনেক বড় করে আঁকা । এই নারীদের অবয়বে মাতিস যে সৌন্দর্য ও গ্রেইস দেখাতে চেষ্টা করেছেন তা তত্কালীন দর্শকের দৃষ্টিগোচর হয়নি । সেকালে এই ছবিতে আঁকা অবয়বগুলোকে নিছক দেহ-অবয়ব হিসেবেই দেখা হয়েছে । শতবর্ষ পরে আজ শিল্পানুরাগী মানুষের কাছে এই ছবির নারীদের সুতনু ও সুন্দর বলেই মনে হয় ।