করোনাকাল
বিচ্ছিন্ন অনুভব
মাহফুজা হিলালী

প্রবন্ধ
অধ্যাপক আনিসুজ্জামান
শামসুজ্জামান খান

গল্প
ডায়মন্ড লেডি ও পাথর মানব
হামিদ কায়সার

গদ্য
নিদ্রা হরণ করেছিল যে বই
মিনার মনসুর

নিবন্ধ
পঞ্চকবির আসর
সায়কা শর্মিন

বিশ্বসাহিত্য
আইজাক আসিমভের সায়েন্স ফিকশন
অনুবাদ: সোহরাব সুমন

বিশেষ রচনা
প্রথম মহাকাব্যনায়ক গিলগামেশ
কামাল রাহমান

শ্রদ্ধাঞ্জলি
মুজিব জন্মশতবর্ষ
মারুফ রায়হান
 
সাক্ষাৎকার
কথাশিল্পী শওকত আলী

জীবনকথা
রাকীব হাসান

ভ্রমণ
ইম্ফলের দিনরাত্রি
হামিদ কায়সার

ইশতিয়াক আলম
শার্লক হোমস মিউজিয়াম

নিউইর্কের দিনলিপি
আহমাদ মাযহার

শিল্পকলা
রঙের সংগীত, মোমোর মাতিস
ইফতেখারুল ইসলাম

বইমেলার কড়চা
কামরুল হাসান

নাজিম হিকমাতের কবিতা
ভাবানুবাদ: খন্দকার ওমর আনোয়ার

উপন্যাস
আলথুসার
মাসরুর আরেফিন

এবং
কবিতা: করেনাদিনের চরণ

১৬ বর্ষ ০৯ সংখ্যা
এপ্রিল ২০২৪

লেখক-সংবাদ :





সংস্কৃতির শত্রুমিত্র
ফজলুল আলম
যতই সময় এগিয়ে চলছে, বহুল ব্যবহৃত ‘সংস্কৃতি’ শব্দটি তার মহিমা হারাচ্ছে। মনে হচ্ছে ‘সংস্কৃতি’র শত্রু দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। শুধু মহিমা হারাচ্ছে বলা কম হয়, বলতে হয় যে উদ্দেশ্যে ঔপনিবেশিক ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ‘সংস্কৃতি’ ব্যবহার করছিল সেই উদ্দেশ্য এখন আর রক্ষা করা যাচ্ছে না। ফলে যে কোনও জাতিগোষ্ঠী সম্পর্কে ‘সংস্কৃতি’ শব্দটির প্রয়োগই অর্থহীন হয়ে উঠেছে। এটা প্রচলিত সংস্কৃতি-ধারণার বিরোধিতার তুতীয় ধাক্কা। এটাকে ‘সংস্কৃতি-বিরোথীতত্ত্ব’ বলা যায়। শব্দবন্ধনটি একটু জটিলতার আভাস দিচ্ছে। ইংরেজিতে এটাকে অ্যান্টি-কালচারলিস্ট থিয়োরি (Anti-Culturalist Theory) বলা হচ্ছে। এই তত্ত্ব নেতিবাচক হলেও এত যুক্তি আছে, এবং আমার মতে এটাকে ¯্রফে ‘সর্বশেষ সংস্কৃতিতত্ত্ব’ বলা যথাযথ হয় না। এখন পর্যন্ত সাধারণ ধারণায় সংস্কৃতি একটা সমঘনত্ব সম্বলিত জাতীয় বিষয় সংস্কৃতি ঐতিহাসিকভাবে স্থাপিত ঐতিহ্য, অথবা আদি জৈবিক নৃ-গোষ্ঠী লালিত ও ঐকমত্যে স্বীকৃত। এই সাংস্কৃতিক বিশিষ্টতা এখন ভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করার প্রগাঢ় প্রক্রিয়ার সম্মুখীন। অতীত ও বর্তমানের চলমানতার অংশ হিসেবে সংস্কৃতির ব্যাখ্যায় নতুন কিছু আর পাওয়া যাচ্ছে না, অথচ বিশ্বের সকল জনগণের সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক মনোভাব এখন পরিবর্তনমুখী।
সংস্কৃতি-ধারণা উনিশ শতকে ভাষায় জোরালোভাবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে। সে সময়কার ধারণাকে প্রথম পর্যায়ের সংস্কৃতি-ধারণা বলাই যথাযথ হয়। বিশ শতকের মাঝামাঝি সেটা পূর্ণভাবে চালু ছিল। ষাটের দশকে সমাজবাদে বিশ্বাসী কয়েকজন লেথক-প-িতদের কর্মকা-ে সংস্কৃতি-ধারণাকে ‘আধুনিক’ পর্যায়ে আনার প্রচেষ্টা করা হয়। এই সময়ে প্রথম পর্যায়ের সংস্কৃতি-ধারণা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হলেও অনেক স্থানে টিকে যায়। সহ¯্রাব্দের আগেই সেই ‘আধুনিক’ প্রচেষ্টা প্রতিক্রিয়াশীলদের জন্য অথবা নিজেদের দুর্বলতার জন্য দুর্বল হয়ে যায়। প্রথম পর্যায়ের সংস্কৃতি-ধারণার সঙ্গে ‘আধুনিক‘ ধারণার বিশাল দ্বন্দ্ব থাকলেও দুটোই ‘সংস্কৃতিতত্ত্ব’ (বা কালচারালিজম)। বর্তমানে আমরা যে ‘সংস্কৃতিতত্ত্ব-বিরোধিতা‘ (বা অ্যান্টি-কালচারালিজমের) কথা বলছি সেটা অনেকাংশে সংস্কৃতি-ধারণাকেই নাকচ করে অথবা ক্ষেত্রবিশেষে সংস্কৃতিকে উদ্ভাবন করা হয় বলে দাবি করে।  
প্রথম পর্যায়ের সংস্কৃতি-ধারণায় ধাক্কা এসেছিল ‘সংস্কৃতি’কে উচ্চ শ্রেণীর একচেটিয়া অধিকারের ধারণা থেকে নামিয়ে সাধারণ জনগণের মধ্যে টেনে আনাতে। এটাতে অবশ্য যাঁরা ‘সংস্কৃতি’ বলতে শুধু ‘সংস্কৃতিবান’ ব্যাপার-স্যাপার মনে করেন, তাঁরা খুব একটা বিচলিত হন নি। অনেকে ওই নামিয়ে আনার যুক্তি তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতেও দ্বিধা করেন নি। তাঁরা অনেকেই গ্রামীণ শৈল্পিক উদাহরণ হিসেবে মাটির তৈজসপত্র, মেলার পুতুল, এমনকি হাল লাঙ্গলের ছোট অনুকৃতি, কাঁথা ইত্যাদি অনেক কিছু ঘরে সাজিয়ে রাখেন, কিন্তু ওই পর্যন্তই ‘আসল’ সংস্কৃতির দাবিদার উচ্চবর্গীয়রাই থাকেন। নিজ দেশের এই ‘সংস্কৃতি’গত অবস্থানের সাথে অর্থাৎ উচ্চবর্গীয় গোষ্ঠীর সাথে সাধারণ মানুষের পার্থক্য যে অতীতের বৈদেশিক শক্তির কাছে নিজ দেশের নিচু দৃষ্টিভঙ্গি মিলে যায়, সেটা কিন্তু এই উচ্চবর্গীয়রা জানলেও না জানার ভান করে চলছেন। একসময়ে ঠিক এটাই ঔপনিবেশিক শাসকরা বিশ্বময় প্রবর্তন করেছিল এবং এখনও সেটার জের চালিয়ে যাচ্ছে। তারা ‘সংস্কৃতি’-ধারণা দিয়ে ‘আমরা’ ও ‘ওরা’র মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করে রেখেছে এখনও আমরা শ্বেতাঙ্গদের কাছে পুরোপুরি ‘উন্নত মানুষ’ হতে পারি নি। নিজ দেশের জনগোষ্ঠীকে ‘সংস্কৃতি’ দিয়ে বর্তমান সময়ে বিভাজিত করে উচ্চবর্গীয় জনগণ অতীতের ঔপনিবেশিক শাসকের ভেক ধরে আত্মতুষ্টিতে নিমগ্ন। এই বিষয়-সম্বন্ধীয় তত্ত্ব ও বাখ্যা এই অধ্যায়ে আলোচনা করা হয়েছে। এখানেই পাঠককে জানিয়ে রাখা প্রয়োজন এই তত্ত্ব ও ব্য্খ্যাগুলোর ওপরে ভিাত্ত করে ‘সংস্কৃতিতত্ত্ব-বিরোধী’ ধারণা বা অ্যান্টি-কালচারালিজমের সৃষ্টি হয়েছে।
 
‘সংস্কৃতি’ সব সময় সহজাত নয়, সংস্কৃতি উদ্ভাবন করাও হয়

এই বইটি সংস্কৃতি-ধারণায় পরিবর্তনপ্রয়াসী। আমরা মনে করি সংস্কৃতি একটা জাতি অথবা নৃ-গোষ্ঠীর অপরিহার্য বিষয়। এই অপরিহার্যতার সাথে যোগ করা যায় যে, সেই জাতি অথবা নৃ-গোষ্ঠীর প্রতিটি সদস্য সেই সংস্কৃতির ধারক বা বাহক, এবং তাদের সংস্কৃতির রূপরেখা পরিষ্কার করে তুলে ধরলে তাদের পরিচিতি (identity) স্পষ্ট হবে। সেই সাংস্কৃতিক পরিচিতি দিয়ে তাদের সঙ্গে অপর জাতি অথবা নৃ-গোষ্ঠী কীরূপ ব্যবহার করবে তা নির্ণীত করা যাবে। এটাই প্রচলিত সংস্কৃতি-ধারণার ভিত বললে খুব একটা ভুল হবে না। এই ধারণা সঠিক কি না সেটা প্রশ্নযোগ্য। একটি জাতি বা জাতিগোষ্ঠীর পরিচিতি নিয়ে অন্য জাতি বা গোষ্ঠী যা মনে করে তা আংশিক সত্য হলেও সেই বর্ণিত পরিচিতি সবার প্রতি প্রযোজ্য হবে তেমন মনে করার পক্ষে কোনও যুক্তি নেই। ভারতীয় পরিস্থিতিতেও সংস্কৃতি উদ্ভাবন করার প্রচেষ্টা শুরু হয় মুসলমান জনগোষ্ঠীর জন্য আলাদা রাষ্ট্রের দাবি ও প্রতিষ্ঠার সময় বঙ্গে ‘মুসলমান বাঙালি সংস্কৃতি’ ও পশ্চিমপ্রান্তে ‘পাকিস্তানি সংস্কৃতি’ উদ্ভাবিত করার জন্য তৎকালীন বুদ্ধিজীবী ও অনেক আন্তরিক বিদ্বজ্জনও চেষ্টা করেছিলেন। রাষ্ট্র যে একক সংস্কৃতির হতে হবে না, এ ধারণা আমাদের ছিল না বলে মনে হয়; থাকলেও তা প্রকাশ করার রাজনৈতিক পরিস্থিতি হয়তো তখন ছিল না। (তবে ইউরোপিয়ান নেশান স্টেট এক জাতি ও সংস্কৃতির মনে করে আমাদের নেশান স্টেট বাংলাদেশও তেমনি একক জাতি ও সংস্কৃতির হওয়া বাঞ্ছণীয় সেটাও অনেকে মনে করতে পারেন)। পূর্ব বঙ্গে অসাম্প্রদায়িকতায় বিশ্বাসী প্রগতিশীলরা ‘মুসলমান বাঙালি’র ধারণা নানাভাবে ও ভাবভঙ্গিতে প্রত্যাখ্যান করলে তাঁরা পশ্চিম বঙ্গের হিন্দুদের দোসর হিসেবে চিহ্নিত ও নিন্দিত হন। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিকভাবে দ্বিখ-িত বঙ্গের বাঙালি সংস্কৃতির ভিন্নতা ধর্মের ভিত্তিতে নির্ণয় করাকে এক অর্থে সংস্কৃতির বা সাংস্কৃতিক পরিচিতি উদ্ভাবন বলে অভিহিত করা যায়।     
ভারতীয়দের বা ইউরোপিয়ানদের বা আফ্রিকানদের বা চীনাদের একটিমাত্র সাংস্কৃতিক পরিচিতি দিয়ে বিচার করা যায় না, কারণ তারা যে দেশে বাস করে সেখানে নানা জাতি, নানা ভাষা, নানা ধর্ম, নানা আচারবিচার, নানা বিধিনিষেধ, নানা পালাপার্বন, নানা উৎপাদন-ভিত্তিক অর্থনীতি এবং সেই অর্থনীতির ফলে সৃষ্ট নানা সামাজিক, মানবিক ও মানসিক অবস্থান ইত্যাদি প্রচলিত। ভারতীয় উপমহাদেশের উদাহরণ টেনে বলা যায় আমরা জানি যে, এক কথায় ভারতীয় সংস্কৃতি বা ভারতীয়দের সাংস্কৃতিক পরিচিতি বর্ণনা করা যায় না। তবে উপনিবেশিককালে ভারতীয়দের বৈশিষ্ট্য কী সেটা ব্রিটিশরা নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী ‘বুঝে’ নিয়েছিল এবং সেভাবেই ‘ভারতীয়দের’ এক ছাঁচে ঢেলে (stereotype করে) দিয়েছিল। উপনিবেশ শেষ হলেও ভারতীয় বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ব্রিটিশদের রটনা এখনও কৌতুক জোগায়। এককথায় ভারতীয়দের ওই ছাঁচে ফেলা পরিচিতিজ্ঞাপক বৈশিষ্ট্যগুলো অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। অনুরূপভাবে বিশ্বের সকল জাতিগোষ্ঠী সম্পর্কে বেশ কিছু সাংস্কৃতিক বিশিষ্টতার কথা প্রচলিত হয়ে গেছে, সেসব সাহিত্যে, নাটকে, হাসিঠাট্টায়, রসিকতায় ঢুকে গিয়েছে। ভালো বিশিষ্টতা সবই বিশ্বের প্রতাপশীল দেশের অধিবাসীদের, আর হাস্যকর অথবা অবমাননাকর বিশিষ্টতা দুর্বল ও একসময়ে পদানত দেশের জাতিগোষ্ঠীর ওপর প্রযোজ্য হয়ে চলছে।

অভিবাসন ও বাস্পায়িত সংস্কৃতি

বিশ্বে অভিবাসন ও জনচলাচল বৃদ্ধির ফলে ফলে একটি দেশে বা ভূখ-ে বাস করা নরনারী এখন নিজ দেশের বাইরে অনেক দেশে স্থায়ী অস্থায়ীভাবে বসবাস করে। সেসব দেশের আদি বাসিন্দাদের সঙ্গে নতুন আগমনকারীদের পার্থক্যকে সংস্কৃতির পার্থক্য মনে করা ভুল না হলেও সেটা বিশ্লেষণ করতে হবে। শিল্পোন্নত দেশে শ্রমিক অভিবাসনের ফলে যুদ্ধোত্তরকালে একটি নতুন জনসংখ্যান (demographical) পরিস্থিতি তৈরি হয়। অভিবাসিত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি নির্ণয় করে তাদের দুরবস্থা দূরীকরণে রাষ্ট্র বিশেষ প্রকল্প হাতে নিতে পারে। অবশ্য তাদের সমস্যাকে সংস্কৃতিগত সমস্যা বলে চিহ্নিত করতে অনেক সময় লাগে। প্রথমে তাদেরকে মূল সমাজে মিশিয়ে দেবার (integration) চেষ্টা বিফল হলে বহুসংস্কৃতিতত্ত্বের (multiculturalism) সূচনা করা হয়। এই সব প্রচেষ্টার উদ্দেশ্য ছিল একটাই। সেটা হচ্ছে এক একটি জাতির সংস্কৃতির পরিচিতি জানা, এবং জেনে নিতে পারলে কার প্রতি কী আচরণ করতে হবে সে সম্পর্কে সিদ্ধান্তগ্রহণ করা। এই ক্ষেত্রে দুটি সামাজিক-রাজনৈতিক ধারা অধিকাংশ শিল্পোন্নত দেশে জন্ম নিয়েছে। সংখ্যালঘু ভিন দেশের জনগোষ্ঠীর ‘সংস্কৃতি’ রক্ষার পক্ষে বাম বা সমাজবাদী দলের সদস্যরা দাবি তোলে, এবং সেই দেশের দক্ষিণপন্থীরা এসব দাবির বিরুদ্ধে ‘জাতীয়’ সংস্কৃতি, অন্যভাষায় ‘জাতীয়তাবাদী’ আন্দোলনের পথে এগোয়। আপাত দৃষ্টিতে এদের কর্মকা- ভিন্ন হলেও দুই-ই ‘সংস্কৃতি-ধারণা’য় আস্থা রাখে। 
এই পরিস্থিতিকে অন্য এক দেশে উল্টো করে রফতানি করলে কী দাঁড়াবে? দক্ষিণ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড এসব দেশ শ্বেতাঙ্গ ককেশান ইউরোপিয়ানদের নয়। এসব দেশে শ্বেতাঙ্গরা সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী দল। শ্বেতাঙ্গরা সেখানে অভিবাসিত জনগোষ্ঠী পার্থক্য এই যে তারা সেখানের সকল ক্ষমতার অধিকারী। এরা সে দেশের আধিপত্য নিয়ে রেখেছে। এই দেশগুলির শ্বেতাঙ্গ অধিবাসীদের সংস্কৃতি সেসব দেশের নাম দিয়েই বলা হয়, যেমন দক্ষিণ আফ্রিকান বা অস্ট্রেলিয়ান বা নিউজিল্যান্ডের সংস্কৃতি, অথচ তারা নানা ইউরোপিয়ান দেশের মানুষ। সেসব দেশের আদি জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি সেভাবে বর্ণিত হয় না তাদের গোত্র নামে তাদের সংস্কৃতি বর্ণনা করা হয়।

‘পরিচিতি’ জ্ঞাপনের জন্য ‘সংস্কৃতি’র অর্থহীনতা

এই পরিস্থিতিকে সম্যকভাবে বিশ্লেষণ করলে জাতিগোষ্ঠী সম্পর্কে ‘সংস্কৃতি’ শব্দটির প্রয়োগই অর্থহীন হয়ে ওঠে। শুধু শ্বেতাঙ্গদের সঙ্গে অধিকৃত দেশের আদি অধিবাসীদের সংস্কৃতি নয়, যে কোনও বিশেষ জাতিগোষ্ঠীর তা সে স্বদেশেই হোক বা অভিবাসিত অবস্থাতেই হোক, ‘সংস্কৃতি’ কী সেটা একইভাবে সমস্যাপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই সমস্যার পেছনে যুক্তি ও কারণ দুই-ই আছে। বৃহত্তর বলয়ের অভ্যন্তরে অভিন্ন বস্তুর অবস্থান থাকে না, সেখানে নানা বস্তুর, ভিন্ন প্রকৃতির ও চরিত্রের সমাহার হওয়াই স্বাভাবিক। আরও বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে সেই ভিন্ন সমাহারের মধ্যেও একাত্মতা নেই। সুতরাং বৃহত্তর বলয়ের মধ্যে একটিমাত্র ‘সংস্কৃতি’র ধারণার যেমন সমর্থনযোগ্যতা নেই, তেমনি অভ্যন্তরে যে একটিমাত্র ‘সংস্কৃতি’ বিরাজমান হবে তারও নিশ্চয়তা নেই।
এই বক্তব্য ‘সংস্কৃতি’র উপস্থিতিই অস্বীকার করছে। কিন্তু বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ‘সংস্কৃতি’ না থাকলে তাদের মধ্যকার পার্থক্য নিরূপণ করা কঠিন হয়ে উঠবে, কে উচ্চ অবস্থানে থাকবে তা শক্তি দিয়ে নির্ণীত হরেও এই অবস্থান থেকে পরিত্রানের উপায় একটাই Ñ সেটা হলো ‘সংস্কৃতি’ উদ্ভাবন করা অথবা সামাজিকভাবে সৃষ্টি করা। সেটা করতে গেলে যে  ক্রমান্বয় পদক্ষেপ বা কর্মপদ্ধতির প্রয়োজন তা বিশ্বে এখন সহজলভ্য করে তোলা হয়েছে। প্রথম পদক্ষেপ হচ্ছে একটা জাতি বা গোষ্ঠীকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা; দ্বিতীয়, সেটার একটা শব্দগত পরিচিতি (রফবহঃরঃু) সৃষ্টি করা, কিংবা তেমন পরিচিতিতে আগ্রহান্বিত করা; তৃতীয়, সেই পরিচিতি সর্বজনীনভাবে গৃহীত করা; চতুর্থ, বুদ্ধিজীবীদের (গ্রামশি কর্তৃক ব্যাখ্যায়িত বুদ্ধিজীবী) সাহায্যে সেই পরিচিতিকে সেই জাতির বা গোষ্ঠীর বৈশিষ্ট্য হিসেবে স্থায়ীভাবে উপস্থাপন করা।

কৃত্রিমভাবেই কি সকল নৃ-গোষ্ঠীর পরিচিতি সৃষ্ট হয়েছে?


মোটেই তা নয়। সকল নৃ-গোষ্ঠীর পরিচিতি সহজাত। তাদের ভাষা, জীবনযাপনের কৌশল ( পোষাক-পরিচ্ছেদসহ) , আচারবিচার, সামাজিক কর্মকা-, বিশ্বাস, অতীতের স্মৃতি, লোকগাথা, ইত্যাদি এক এক নৃ=গোষ্ঠীর বিশেষ নামের মধ্যে দিয়ে প্রকাশ পায়। সমস্যা হচ্ছে একটি মাত্র নৃ-গোষ্ঠী কোথাও একটা রাষ্ট্র সৃষ্টি করে নেই। অনেক সম্ভাবনার মধ্যে থাকতে পারে একটি নৃ-গোষ্ঠী একটি দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ ও তারা সে দেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নিয়ে আছে (সরকারি বা বিরোধীদল উভয়েই সেই সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের)। সে দেশের সংখ্যালঘু নৃ-গোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় পরিচয় সংখ্যাগরিষ্ঠদের যা সেটা হলেও তাদের সংস্কৃতিগত পরিচয় ভিন্ন।
ফ্রান্ৎয ফ্যানন একটি জনগাষ্ঠীর শেকড়উদ্ভূত সহজাত সংস্কৃতি সম্পর্কে একটা পরিপক্ব বক্তব্য রেখেছেন যে কেউই তাঁদের আদি সংস্কৃতিকে ফেলে দিতে চান না তাঁদের কাছে সেটা ঐতিহ্য এবং ইতিহাস। তাঁরা অবশ্য অতীতের সেই সাংস্কৃতিক পরিচিতির বদ্ধমূলতা বা নিশ্চলতা এবং মাত্রাতিরিক্ত ভালোবাসা যে বাহিরের জগৎ থেকে বিপদ ডেকে আনে সেটা সম্পর্কে সচেতন থাকেন না।
নিজ দেশের বাইরে অন্য দেশে সংখ্যালঘু গোষ্ঠী হয়তো তাদের আদি পরিচিতি নিয়ে দুঃশ্চিন্তায় নেই, কিন্তু সম্ভাবনা থেকে যায় যে সেই পরিচিতির জন্যই তারা অবদমিত রয়ে যায় এবং রাষ্ট্রের পূর্ণ সুযোগসুবিধা তাদের দেওয়া হয় না। সংখ্যাগরিষ্ঠ কর্তৃক তাদের পূর্ণ সুযোগসুবিধা না দেওয়াকে ‘ন্যায্য’ করে তোলার জন্য সংখ্যালঘুদের বিশেষ পরিচিতি তৈরি করার ব্যবস্থা রাখা বাঞ্ছণীয়, যেমন এদের শিক্ষাদীক্ষা কম, থাকলেও তা মান সম্মত নয়, তারা কর্মবিসুখ, তাদের আচারব্যবহার সহকর্মীদের সঙ্গে মিশ খায় না, ইত্যাদি। এই উদ্ভাবিত পরিচিতিগুলো কালক্রমে তাদের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে গণ্য হতে শুরু করে। সময়ের পরিবর্তনের সাথে ও বৈশ্বিক ব্যবস্থার পরিবর্তনে অথবা নতুন জনসংখ্যান (demographical) পরিস্থিতিতে তাদের পরিচিতি পরিবর্তিত হতে থাকলেও সেটা ধর্তব্যের মধ্যে নেওয়া হয় না। বাম ধারণায় বিশ্বাসীরা অবদমিত জনগোণ্ঠীকে বিশেষ সহায়তা  দেবার জন্য আন্দোলন চালিয়ে যায় (যেমন ব্রিটেনের ১৯৭০ দশকের আগে লেবার পার্টি ও ১৯৯০ পর্যন্ত ‘দি নিউ লেফট’ দল)। এভাবে একটি জনগোষ্ঠীর ওপর আরোপিত পরিচিতির (ascriptive identity) একটা তত্ত্বের ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করা যায়, সেটার নাম অপরিহার্যতা তত্ত্ব (essentialism theory)।
অন্যান্য যে তত্ত্বগুলি অ্যান্টি-কালচারালিজম অধ্যয়নের ক্ষেত্রে প্রযোজন সেসব হচ্ছে : আরোপিত পরিচিতি (ascriptive identity)  ও বহুসংস্কৃতিতত্ত্ব (multiculturalism), বৈপরীততত্ত্ব (ambivalence theory), সঙ্করতত্ত্ব (Hybridity theory), ক্রেয়োলনেস (Creolness), সাদৃশ্য গ্রহণ বা অনুকরণতত্ত্ব (mimicry মিমিক্রি)।
এই ক্ষুদ্র রচনায় এসব চমকপ্রদ তত্ত্বের পূর্ণ ব্যাখ্যার অবকাশ নেই। পাঠককে বইমেলা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

বিশ্বে সংস্কৃতি-ধারণা দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে। সে বিষয়ে আমার জ্ঞানের পরিধি বৃদ্ধি করা জরুরী। ড. ফজলুল আলমের নতুন প্রকাশিতব্য বই সংস্কৃতির শত্রুমিত্র সেই কাজটা করছে। বইটি বইমেলায় আসবে অনন্যা প্রকাশনা।