করোনাকাল
বিচ্ছিন্ন অনুভব
মাহফুজা হিলালী

প্রবন্ধ
অধ্যাপক আনিসুজ্জামান
শামসুজ্জামান খান

গল্প
ডায়মন্ড লেডি ও পাথর মানব
হামিদ কায়সার

গদ্য
নিদ্রা হরণ করেছিল যে বই
মিনার মনসুর

নিবন্ধ
পঞ্চকবির আসর
সায়কা শর্মিন

বিশ্বসাহিত্য
আইজাক আসিমভের সায়েন্স ফিকশন
অনুবাদ: সোহরাব সুমন

বিশেষ রচনা
প্রথম মহাকাব্যনায়ক গিলগামেশ
কামাল রাহমান

শ্রদ্ধাঞ্জলি
মুজিব জন্মশতবর্ষ
মারুফ রায়হান
 
সাক্ষাৎকার
কথাশিল্পী শওকত আলী

জীবনকথা
রাকীব হাসান

ভ্রমণ
ইম্ফলের দিনরাত্রি
হামিদ কায়সার

ইশতিয়াক আলম
শার্লক হোমস মিউজিয়াম

নিউইর্কের দিনলিপি
আহমাদ মাযহার

শিল্পকলা
রঙের সংগীত, মোমোর মাতিস
ইফতেখারুল ইসলাম

বইমেলার কড়চা
কামরুল হাসান

নাজিম হিকমাতের কবিতা
ভাবানুবাদ: খন্দকার ওমর আনোয়ার

উপন্যাস
আলথুসার
মাসরুর আরেফিন

এবং
কবিতা: করেনাদিনের চরণ

১৬ বর্ষ ০৭ সংখ্যা
ফেব্রুয়ারি ২০২৪

লেখক-সংবাদ :





অ্যান্টি-কালচারালিজম
ফজলুল আলম
সংস্কৃতি বিষয়টি মূলধারার অধ্যয়নে এসেছে সেটা যেমন বলা যায় না, তেমনি আসে নি সেটা বলাও ভুল হতে পারে। ‘সংস্কৃতি’ ও ‘সাংস্কৃতিক’ দুটো শব্দই একটি দেশের ও জাতির অতীত ও চলমান বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করতে অবলীলায়, এবং আমার মনে হয় অনেক সময় হেলাফেলায় ব্যবহৃত হয়। সাধারণ ধারণায় একটি জাতির অতীতের সুখস্মৃতি বিজড়িত জীবনের কথাও ‘শেকড়উদ্ভূত সংস্কৃতি’, ‘আবহমান সংস্কৃতি’, ‘শাশ্বত সংস্কৃতি’, ‘ঐতিহ্যবহ সংস্কৃতি’, ইত্যাদি ভাষায় প্রকাশিত হয় এবং সেসব সাহিত্যে ও শিল্পে প্রায় স্থায়ী অবস্থান পায়। শেকড়উদ্ভূত সংস্কৃতি সর্বদাই উৎপাদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। এমনও দেখা গেছে অতীতের উৎপাদন প্রক্রিয়া ও আনুষঙ্গিক অবস্থা এতই পরিবর্তিত হয়ে গেছে যে চলতি সময়ে সেসব পূর্ণভাবে অপসৃত হয়ে উঠেছে। অপসৃত হলেও সেসবকে স্বাভাবিক ও প্রকৃতিসিদ্ধ মনে করে একটি জনগোষ্ঠী সেসবকে ভুলে যেতে বা অস্বীকার করতে চায় না। বিভিন্ন উৎসবে ও পালাপার্বনে সেসবের প্রতি গর্বমিশ্রিত ভালোবাসা বা দুর্বলতা, এমনকি কাব্যিক আতিশয্য প্রায় প্রতিটি জনগোষ্ঠীতে টিকে আছে।

সেই সব সংস্কৃতিকে খাঁটি বলে মেনে নিলে আধুনিক সময়ের সংস্কৃতি অনেকের কাছে কৃত্রিমভাবে সৃষ্ট মনে হয়। এই কৃত্রিমতার ব্যাখ্যা সর্বত্র ও সর্বসময়ে এক হয় না।

একটি জনগোষ্ঠীকে তাদের আবহমান শেকড়উদ্ভূত সংস্কৃতি দিয়ে অন্য জনগোষ্ঠী থেকে পৃথক বা ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়। ‘আমার’. ‘তোমার’ ও ‘তাদের’ সংস্কৃতির ভিন্নতা অবশ্যই তারতম্যব্যঞ্জক। এই তারতম্য থাকার কারণে কোনো কোনো সংস্কৃতিকে ‘উচ্চ’. এবং সেটার তুলনায় অন্য সংস্কৃতিকে ‘নি¤œ’ বলে অভিহিত করার সুযোগ থাকে। ফলে সংস্কৃতিগত তারতম্যের বিষয়টা প্রচার করে শক্তিশালী জাতি বা রাষ্ট্র কর্তৃক অন্য কোনো জাতিগোষ্ঠীকে হেয় করার প্রচেষ্টা চলতে পারে Ñ বৈষম্যমূলক ও অসমতাব্যঞ্জক ব্যবহারও স্বীকৃতি পেতে পারে। চলতি সময়ে, বা আধুনিককালে (ঊনিশ শতক থেকে) পাশ্চাত্যে ‘সংস্কৃতি’ শব্দটির ব্যবহার বৃদ্ধি পায়, এবং সেই সময়ের প্রতাপশালী দেশগুলো এই শব্দটির ব্যাখ্যায় কৌশলে রাজনৈতিক চরিত্র আরোপ করে। এই চরিত্রটি ঔপনিবেশিক স্বার্থ রক্ষা করার কাজে ব্যবহৃত হয়। কিছু গবেষক লেখক এই রূপটি সে সময় থেকেই প্রচার করলেও ‘সংস্কৃতি অধ্যয়নে’ নিয়োজিত বিদ্বজ্জন প্রথম পর্যায়ে সে দিকে নজর দেন নি।

আমার পর্যবেক্ষণে সংস্কৃতিচর্চার বা সংস্কৃতি সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ লেখালেখিতে ‘তিনটি প্রধান ধারা’ লক্ষণীয়। প্রথম ধারা শুরু করেছিলেন ম্যাত্থু আর্নোল্ড (Arnold 1869) ১৮৬৯ সনে। সেই ধারাটি পরে অনেকে, বিশেষত এফ আর লেভিস (Leavis 1933) ও টি এস এলিয়ট (Eliot 1948) টেনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত নিয়ে আসেন।

দ্বিতীয় ধারা রূপ পেতে পেতে বিশ শতকের মধ্যভাগ পার হয়ে যায়। পাশ্চাত্যের শিক্ষায়তনিক অঙ্গনে দ্বিতীয় ধারার পক্ষে-বিপক্ষে সংস্কৃতির চর্চা ও অধ্যয়ন বেশ আলোচনার ঝড় তুলেছিল। এই ধারায় সমাজতান্ত্রিক ধারণা আলোচনায় অনেকটা কেন্দ্রস্থান অধিকার করে।  

তৃতীয় ধারা আসে মাত্র গত শতকের শেষ পর্যায়ে, এবং এখন পর্যন্ত সেটা শিক্ষায়তনিক, বিদ্বৎকুলে, এমন কি সাধারণ আলোচনার মূল ধারার অংশ হয়েছে বলে মনে হয় না। তা সত্ত্বেও এই তৃতীয় ধারা অত্যন্ত সারগর্ভ ও অর্জিত জ্ঞানের সীমানা অতিক্রম করার স্পর্ধা রাখে। এই ধারা পূর্বের দুটো ধারাকে নাকচ না করলেও সর্বপ্রথম দাবি করে যে আধুনিককালে সংস্কৃতির সঙ্গে সা¤্রাজ্যবাদ, ঔপনিবেশিকতা, ইউরোপীয়ান ককেশান শ্বেতাঙ্গ ব্যক্তিদের সঙ্গে অশ্বেতাঙ্গদের বিরোধ - এসবের সম্পর্ক অতি প্রমাণিতভাবে ঘনিষ্ঠ বিধায় ঐতিহাসিকভাবে প্রচলিত ও অধিকাংশ ক্ষেত্রে

গৃহীত সংস্কৃতির ধারণাটিই একটা বিশাল ভ্রান্তি। ইংরেজিতে এই তৃতীয় ধারাকে ‘অ্যান্টি-কালচারালিজম’ বলা হয়, বাংলায় আমার পরিভাষা ‘সংস্কৃতিতত্ত্ব বিরোধিতা’। পাঠক, লক্ষ্য করবেন যে আমি ‘সংস্কৃতি বিরোধিতা’ বলছি না। আমি মনে করি ‘অ্যান্টি’ হলেও এই তৃতীয় ধারার সংস্কৃতি সম্পর্কিত আলোচনা ‘সংস্কৃতি আলোচনার বলয়ে’র বাইরের বিষয় নয়।

এই তিনটি ধারা আলোচনা করার পূর্বে একটা প্রশ্ন না করলেই নয়, এবং সেটার উত্তরও পাওয়া প্রয়োজন। সেটা হলো আমরা ‘সংস্কৃতি‘র নানা ব্যাখ্যার মধ্যে কোনটা গ্রহণ করব। আধুনিক সময়ে অর্থাৎ উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে এর দুটো ব্যাখ্যা প্রাধান্য পেয়েছে; একটা হলো একটি জনগোষ্ঠীর শেকড় উদ্ভূত সংস্কৃতি, ও অপরটি হলো সভ্যতা ভিত্তিক সংস্কৃতি। প্রথমটি এখনো অনেকের মনে গেঁথে আছে. তাঁরা সেটাকেই একটি জাতি গোষ্ঠীর মূল এবং/অথবা শাশ্বত সংস্কৃতি হিসেবে গণ্য করেন। তাঁদের যুক্তিমতে সেটা ব্যতিরেকে জনগোষ্ঠীর পরিবর্তিত সংস্কৃতি আধুনিক বা চলমান সময়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও সেসব অনেকটাই মেকি এবং বহিঃবিশ্ব প্রভাবিত। এক পর্যায়ে ‘সভ্যতা‘র ধারণা বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত হলে ‘সভ্যতা-ভিত্তিক সংস্কৃতি‘ শিক্ষিত জনগণের মনে আসন গাড়ে। তাদের কাছে তখন প্রথম শেকড় উদ্ভূত আবহমান সংস্কৃতি নৃ-তাত্ত্বিক গবেষণার বিষয় হয়ে ওঠে।  যদিও সেসব সংস্কৃতি উৎপাদন প্রক্রিয়া ও সেই প্রক্রিয়া উদ্ভূত সামাজিক ব্যবস্থা সম্পর্কিত, এবং উন্নত বিশ্বে সেসব পরিবর্তিত হয়ে গেছে, বিশ্বের অধিকাংশ দেশে বিশেষত ‘তৃতীয় বিশ্বে‘ সেসবে লক্ষণীয় পরিবর্তন এখনো হয় নি। তবে এমন নয় যে বিশ্বের সর্বত্র শেকড় উদ্ভূত সংস্কৃতিকে পুরোপুরি বিসর্জিত করা হচ্ছে। অনেকে ব্যক্তিগতভাবে সেসব নানাভাবে স্মৃতিতে লালন করেন এবেং অনেক দেশে সেসবকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দিয়ে উদযাপিত করা হয় - সেসবের মধ্যে জীবনযাপনের, পোশাকআসাক, সঙ্গীত, নৃত্যগীত, পালাপার্বন অনেক কিছু ‘আধুনিক’ নগরজীবনে উৎসাহের সঞ্চার করে।
 
এই রচনায় আমরা অবশ্য ‘সংস্কৃতি‘র ব্যাখ্যা হিসেবে আধুনিক বা বর্তমান সময়ের সংস্কৃতি‘কে গ্রহণ করছি। এই সংস্কৃতি এবং অতীতের সংস্কৃতির মধ্যে যে বিস্তর ফারাক আছে তা বিচার করার প্রয়োজন এখানে নেই, তবে কেন বর্তমান আলোচনায় দ্বিতীয় ব্যাখ্যাটি গ্রহণ করতে হবে সেটা সম্মানীত পাঠককুলকে জানানো প্রয়োজন। এই ব্যাখ্যায় আমরা বিশ্বে সা¤্রাজ্য বিস্তারকাল থেকে শুরু করে উপনিবেশকাল, উত্তর-উপনিবেশকাল, আধুনিককাল, উত্তর-আধুনিককাল (?), ও বর্তমান সময়ের ‘সংস্কৃতি‘ নিয়ে আলোচনা করতে সক্ষম হব।

সংস্কৃতিচর্চার প্রথম ধারা : ‘এলিটিস্ট’ বা আভিজাত্যভিত্তিক সংস্কৃতি-ধারণা

বিশ শতকের শুরুতে প্রচারিত ব্রিটেনের সংস্কৃতি-ধারণার সাথে ভারতবর্ষের শিক্ষায়তনিক পরিচয় হয়, কিন্তু ‘সংস্কৃতি’ ভারতে বা বঙ্গে সে সময়ে অপরিচিত বিষয় ছিল না। সর্বপ্রথম সেটাতে দ্বিমত পোষণ করেন ঐতিহাসিক ও গবেষক নীহাররঞ্জন রায়। স্বয়ং টি এস এলিয়টের ‘নোটস টুওয়ার্ডস দা ডেফিনিশান অফ কালচার’ (১৯৪৮) পড়ে তিনি তাঁর আপত্তি লিপিবদ্ধ করেন। (নীহাররঞ্জন রায় ১৯৭৯; ফজলুল আলম ২০১৫: ২৮)। নীহাররঞ্জন রায়ের আপত্তির যৌক্তিকতা জেনেও ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত বাঙালি বিদ্বজ্জন টি এস এলিয়ট ও এফ আর লেভিসের বক্তব্য সমর্থন করে চলেছেন। লেভিস ও এলিয়ট এই দুই পাশ্চাত্য প-িতের দুটো উদ্ধৃতি এখানে তুলে দিলাম:

অভিজাত ও উচ্চবর্গের ব্যক্তিরা সংখ্যায় ছোট - এঁরাই শিল্প ও সাহিত্যের সমঝদার হবেন। ... এঁরা শুধু দান্তে, শেক্সপিয়র, ডান, বোদলেয়ার বোঝেন তা নয়, এঁরা আমাদের জাতির বিবেক হিসেবে যাঁদের উত্থান হচ্ছে তাঁদেরও যথাযথভাবে চিহ্নিত করতে পারেন। এই ছোট গোষ্ঠীর ওপরেই ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ দিকগুলো থেকে অভিজ্ঞতালব্ধ মানবসভ্যতার লাভ নিরূপণ করার ভার আছে এবং এঁরাই ঐতিহ্যের অতি সূক্ষ্ম ও ভঙ্গুর অংশসমূহ বাঁচিয়ে রাখতে পারেন। (Leavis 1933:13  ভাষান্তর লেখকের)

এর পনের বছর পরে টি এস এলিয়টের কলম থেকে একই বক্তব্য প্রকাশ পায়,

সংস্কৃতিকে চলমান রাখার জন্য সামাজিক শ্রেণীগুলো বজায় রাখতে হবে, বিশেষ করে শাসকশ্রেণীর হাতে নিয়ন্ত্রণ রাখতেই হবে। শাসকশ্রেণীর ও সমাজের উচ্চশ্রেণীর লোকজন ভিন্ন প্রকৃতির, তথাপি সংস্কৃতির ঐতিহ্যকে চলমান রাখার জন্য তাদের একে অপরকে প্রয়োজন। (Eliot 1948: 68  ভাষান্তর লেখকের)

অন্য ভাষায় তাঁদের মতে ‘সংস্কৃতির পতাকা’ বহন করবে শিক্ষিত ও সমাজের উচ্চস্তরের মানুষেরা। এই ধারণাই ‘এলিটিস্ট’ বা আভিজাত্যভিত্তিক সংস্কৃতি-ধারণা। সেটা ঔপনিবেশিক শক্তিধারক শ্বেতাঙ্গ দেশে আগ্রহসহকারে আদৃত হয়। যদিও এই ধারণায় নিজ দেশের জনগণের মধ্যেই শ্রেণী বিভাজনকে স্পষ্ট করে তোলা হয়, সেটাকে ধর্তব্যের মধ্যে না এনে উপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠী সংস্কৃতিতে একমাত্র তাদেরই অধিকার আছে এই ধারণা অ-শ্বেতাঙ্গ শাসিত দেশগুলোতে প্রচলন করে। আশ্চর্য হতে হয় যে এই ধারণাটি যে সংস্কৃতিতে অভিজাত ও বিত্তবান ব্যক্তিদের অধিকার থাকবে সেটা খুবই সহজে শিক্ষিত বাঙালি গ্রহণ করেছিল। বিশ্বের জ্ঞানচর্চায় এই ধারণার পরিবর্তন হয়েছে ও অনেকে একে চ্যালেঞ্জ করে, সেসব জেনেও অনেক শিক্ষিত বাঙালি ও ভারতীয় সংস্কৃতির ‘এলিটিস্ট’ ধারণায় বিশ্বাসী। তাঁরা বুঝতে বা বিশ্বাস করতে অপারগ যে এই ব্যাখ্যা  স্বদেশের জনগোষ্ঠীকে জাতি হিসেবে খাটো করে তোলার কৌশল। হয়তো বা অনেকে বোঝেন তবুও অনেক শিক্ষিত বাঙালি ভদ্রলোক নিজেদের সেই ব্যাখ্যা অনুসরণ করেই সংস্কৃতিবান হওয়ার প্রচেষ্টা করেন। রবীন্দ্রনাথ নিজেও ‘সংস্কৃতিমান’ শব্দটি সংস্কৃতির ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছিলেন।  ১৯৬০ সনের আগে ইউরোপে ও উত্তর আমেরিকায় এই ধারণাকেই অধিকাংশ শিক্ষিত ও অভিজাত গোষ্ঠী সংস্কৃতির অকাট্য ব্যাখ্য বলে মনে করতেন। এটাকে আমরা সংস্কৃতিচর্চার প্রথম ধারা বলে অভিহিত করতে পারি।

সংস্কৃতিচর্চার দ্বিতীয় ধারা : জনগণ সম্পৃক্ত সংস্কৃতি ধারণা

দ্বিতীয় ধারা আগমনের প্রেক্ষাপট অনেক বৃহৎ বলা যায়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ তো বটেই, বিশ্বে সমাজতন্ত্রের আবির্ভাব ও ঔপনিবেশিক যুগের সমাপ্তি, বৈজ্ঞানিক ধ্যানধারণায় সাধারণ মানুষের দীক্ষা ও আরো অনেক ঐতিহাসিক উপাদান ‘আভিজাত্যভিত্তিক’ সংস্কৃতিতে কিছুটা অনাস্থা স্থাপন করে। এই দ্বিতীয় ধারাকে আমি ‘জনগণ সম্পৃক্ত সংস্কৃতি ধারণা’ বলে চিহ্নিত করি। অনেক সমাজ বিশ্লেষক মনে করেন এই পর্যায়ে সংস্কৃতিচর্চায় সমাজতন্ত্রের ব্যবহার শুরু হয়। অবশ্য সমাজতন্ত্র এই দ্বিতীয় ধারা সরাসরি নিয়ে আসে নি, উল্টো প্রথম ধারাকে নাকচ করার তত্ত্বগত কর্মকা-ে সমাজতন্ত্র স্বাভাবিক গতিতেই দ্বিতীয় ধারায় প্রবেশ করে।

এই দ্বিতীয় ধারাটি শুরু করেন দুইজন ব্রিটিশ শিক্ষাবিদ রিচার্ড হোগার্ট ও রেমন্ড উইলিয়ামস। সংস্কৃতি অধ্যয়নে সমাজতন্ত্রের আগমনের পথ উদ্বারিত করলেও তাঁরা সেটা প্রত্যক্ষভাবে করেন নি। ব্রিটেনে শ্রমিকদের জন্য নৈশ প্রতিষ্ঠানে পড়াতে গিয়ে তাঁরা আবিষ্কার করেন যে পাঠ্যক্রমে, বিশেষত সাহিত্য পাঠ্যক্রমে পরিবর্তন আনা জরুরি, কারণ উচ্চ ও মধ্য শ্রেণীর উদ্দেশ্যে তৈরি পাঠ্যক্রম শ্রমিক শ্রেণীর সংস্কৃতি ও মনমানসিকতা গ্রহণ করতে পারে না। পূর্বে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না পাওয়া একজন প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিক যখন জেন অস্টেন পড়েন তখন তিনি উপন্যাসটির চরিত্র, সংলাপ, ঘটনা ও মনস্তত্ত্ব¡ কোনোটাই যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পারেন না। কারণ, কাহিনীর চরিত্র, চরিত্রের ভাষা ও ঘটনা পাঠকের জীবন থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। শিক্ষার পাঠ্যক্রমে সর্বত্রই এই সাংস্কৃতিক পার্থক্য বিশেষত শ্রমিক শ্রেণীর ভাষাগত, মনমানসিকতা ও পারিপার্শ্বিকতার পার্থক্যে শিক্ষার মাধ্যমে জ্ঞান আহরণ সম্পূর্ণ হয় না। সুতরাং সংস্কৃতির ব্যাখ্যার পরিবর্তন আনা অতি প্রয়োজন। এই পরিবর্তনকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে রূপ দেওয়া সম্ভব হয় ১৯৬৩ সনে বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সেন্টার ফর কনটেম্পোরারি কালচারাল স্টাডিজ (Centre for Contemporary Cultural Studies, or CCCS, University of Birmingham) স্থাপিত হলে - রিচার্ড হোগার্ট প্রথম ডিরেক্টার পদে আসীন হন। পরবর্তীকালে এই পদ অলংকৃত করেন স্টুয়ার্ট হল ও রিচার্ড জনসন। বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কৃতি বিষয়ে বিধিবদ্ধভাবে পঠনক্রিয়া শুরু হলে সেসব প্রশ্ন ও বিবিধ সম্পৃক্ত বিষয় শুধু আলোচিত নয়, যুক্তি-তর্কের জোয়ারে শিক্ষাবিদ, সমাজতত্ত্ববিদ, রাজনীতিবিদ, চিন্তাবিদ এবং আরও অনেককে ভাসিয়ে নিয়ে গেল। সেন্টার ফর কনটেম্পোরারি কালচারাল স্টাডিজ কেন্দ্রে ‘সংস্কৃতি’কে অবশ্যই আর্নোল্ড-এলিয়ট-লেভিসের দৃষ্টিভঙ্গিতে না দেখে ভিন্নভাবে দেখা হয়।

দ্বিতীয় ধারায় একটা বিষয় ওপরে উঠে আসে যে সংস্কৃতির ধারণাগুলো একাধারে যেমন সমাজে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর তারতম্য প্রকাশ করে, তেমনি বিশ্বের জনগণের মধ্যে পার্থক্যও তুলে ধরে। অর্থাৎ স্থানিক ও বৈশ্বিক জনগোষ্ঠীর শ্রেণীগত পার্থক্যগুলো সংস্কৃতির মধ্য দিয়েই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অন্যভাবে বলা যায় যে সংস্কৃতি দিয়ে যে কোনো জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিভাজন বজায় রাখা অর্থাৎ জনগণকে ভিন্নভাবে দেখা ও তাদের মধ্যে বৈষম্য বজায় রাখা যায়। এই সব বৈষম্য ও শ্রেণীবিভাজন অমানবিক হলেও জনগণ এসব নিয়েই দিব্যি বসবাস করছে। এই অদ্ভুত সংহতি এবং অমানবিক ব্যবস্থাকে প্রতিপালন করার জন্য জনগোষ্ঠীর যে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্মতির প্রয়োজন হয়, সেসব কীভাবে সৃষ্টি হয়? মনে হয় সমাজতত্ত্ব নয়, নৃ-বিজ্ঞান নয়, রাষ্ট্রবিজ্ঞান নয়, অর্থনীতি নয়, এমন কি সাহিত্যও এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না। সংস্কৃতির দ্বিতীয় ধারায় এই নতুন উপলব্ধি ব্যাখ্যা, ও নতুন নতুন প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করার প্রচেষ্টা আছে।  

দ্বিতীয়টি বঙ্গে বা এই উপ মহাদেশে একেবারে অজানা কখনোই ছিল না। এই ধারাটি স্বাভাবিকভাবেই শেকড়-উদ্ভূত সংস্কৃতির কাছাকাছি আবস্থান করে। এই ভূখ-ের কয়েকজন বিজ্ঞ লেখক ও গবেষষকদের ‘জনগণ সম্পৃক্ত সংস্কৃতি’ কী হতে পারে তা পাশ্চাত্যের কাছ থেকে শিখে আসতে হয় নি। বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপস্থাপিত ব্যাখ্যা আসে বিগত শতকের ছয় দশকে, আর বঙ্গে একই ভাবধারায় সংস্কৃতি বিষয়ে সচেতনতা এসে গিয়েছিল চার দশকেই। (এ বিষয়ে এখানে কালক্ষেপণ করার খুব একটা অবকাশ নেই তবে এ প্রসঙ্গে আমার বিভিন্ন প্রকাশনা ও বিশেষত সংস্কৃতিতত্ত্ব ও বাঙালি (২০১৫) বইটিতে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা আছে) 

সংস্কৃতিচর্চার তৃতীয় ধারা : ‘অ্যান্টিকালচারালিজম’ বা সংস্কৃতিতত্ত্ব বিরোধিতা

প্রথম ও দ্বিতীয় ধারার সন্ধান থাকলেও বঙ্গে তৃতীয় ধারাটি একেবারে অনুপর্স্থিত বলা ভুল হবে না। এই তৃতীয় ধারা ‘সংস্কৃতি’র পূর্বের প্রচলিত দুই ধারাকেই ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখে এবং সেসবকে ধারণাকে ঔপনিবেশিক অস্ত্র বলে নাকচ করে দেয়। এই তৃতীয় ধারাকে ইংরেজিতে ‘অ্যান্টিকালচারালিজম’ বলা হয়। বাংলায় আমি এর পরিভাষা করেছি ‘সংস্কৃতিতত্ত্ব বিরোধিতা’।

কী এই তৃতীয় ধারা? এটা বিশ্বে ‘অ্যান্টিকালচারালিজম’ নামে এখন সুপ্রতিষ্ঠিত একটি তত্ত্ব। মনে করা স্বাভাবিক যে এটা ‘কালচারালিজমে’র বিপক্ষে বা বনাম। সেটা মনে করা যথাযথ হবে না। এই ধারায় প্রথম দুই ধারার সংস্কৃতিতত্ত্বগুলো নাকচ হয়ে যায়। এমন কি বলাও যায় যে, এই তৃতীয় ধারা পূর্বে প্রচলিত ‘কালচারালিজম’ বলে বর্ণিত সংস্কৃতিতত্ত্বের দুইটি ধারাকেই অন্তিম পর্যায়ে নিয়ে গেছে। তার পরেও বিশ্বে সংস্কৃতি অধ্যয়নের ইতিহাসে ‘কালচারালিজম’ ও ‘অ্যান্টিকালচারালিজম’ দুইই থাকবে, এবং বিষয়টির সামগ্রিক অধ্যয়নে দুটোই গুরুত্ব পাবে। তবে এমনো হতে পারে প্রথম দুটো ধারা যে জনগোষ্ঠীভিত্তিক ছিল, তারা শুধু তৃতীয় ধারাতেই বিশ্বাস রাখবে।

অ্যান্টিকালচারালিজম ব্যাখ্যার পূর্বপ্রস্তুতি

‘অ্যান্টিকালচারালিজম’ সম্পর্কে অনেক সমর্থক ও বিরুদ্ধ রচনা পড়ে আমি এই ধারণায় উপনীত হয়েছি যে কয়েকটি বিষয়ে মানসিক পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়া অ্যান্টিকালচারালিজম ধারণা বোঝা সম্ভব নয়। এই পূর্বপ্রস্তুতিগুলো হবে নিম্নরূপ :
- ওপরে বর্ণিত ‘এলিটিস্ট’ বা ‘আভিজাত্যভিত্তিক’ ও ‘জনগণ সম্পৃক্ত সংস্কৃতি’ ধারণা দুটোকেই অগ্রাহ্য করতে হবে। অগ্রাহ্য করার প্রধান কারণ এই দুই ধারণায় অনেক ভ্রান্তি আছে। মনে করা হয় যে একটা জাতি অথবা নৃ-গোষ্ঠীর বশিষে সংস্কৃতি থাকতে হবে এবং থাকলে তাদের সম্পর্কে ধারণা অন্যদের কাছে পরিষ্কার হবে ও তাদের পরিচিতি (রফবহঃরঃু) স্পষ্ট হবে। এই ধারণা আংশিক সত্য হলেও সেই পরিচিতি সেই জাতি বা গোষ্ঠীর সকল সদস্যের প্রতি প্রযোজ্য হবে তেমন মনে করার পক্ষে কোনো যুক্তি নেই।
 - দ্বিতীয়ত, আধুনিক সময়ে ‘সংস্কৃতি’ ধারণার উদ্ভাবন ও ব্যবহার এমনভাবে হয়েছে যে সংস্কৃতি ধারণা পুরোটাই উত্তর-ঔপনিবেশিক তত্ত্ব সমর্থন করে। অন্যভাবে বলা যায় আধুনিক সময়ে সংস্কৃতির ধারণা উপনিবেশ বিস্তারে ও রক্ষণে ঔপনিবেশিক শক্তির পক্ষে অতি প্রয়োজনীয় সমর্থনমূলক কাজ করে চলছে। সংস্কৃতির যে আদি (বা শাশ্বত) ধারণা সেটার সাথে ঔপনিবেশিককালে সৃষ্ট সংস্কৃতি ধারণার কোনো সঙ্গতি না থাকার সম্ভাবনা বেশি, সম্পৃক্ততা থাকলেও তা জোর করে আনা হয়েছে।
 - এই দ্বিতীয় অবস্থানের সঙ্গে যোগ করা যেতে পারে Ñ দাসপ্রথা, নির্দিষ্ট সময়ের জন্য শ্রম ক্রয় (ইনডেনচারড লেবার), শ্রম এবং মেধার অভিবাসন, এবং যুদ্ধ ও সামাজিক/সাম্প্রদায়িক/শ্রেণীভিত্তিক দ্বন্দ্বের ফলে শরণার্থীদের আন্তর্জাতিক চলাচল। এই বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর বিভিন্ন দেশে চলাচলের ফলে যে সংস্কৃতিগত মিশ্রণ ঘটে সেটার পুরোপুরি বিশ্লেষণ পূর্বে বণিত সংস্কৃতির দুই ধারায় ব্যাখ্যায়িত করা যায় না।
 - আমরা আরো মেনে নেবো যে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সংস্কৃতি সম্পর্কে উপনিবেশকাল থেকে কিছু সফল উপনিবেশ সমর্থক ‘বুদ্ধিজীবী’ সাহিত্যিক ও গবেষক একটা বৈশ্বিক ধারণা সৃষ্টি করে চলছেন। এডওয়ার্ড সাঈদ সাহিত্য থেকে উদাহরণে টেনে, বিশেষত কিপলিং, কনরাড, জেরোমে (এবৎড়সব) , এমন কি ফ্লবার্টকে উদ্ধৃতি করে প্রতিষ্ঠিত করেন যে এই সাহিত্যিকগণ বাইরের জগৎকে বর্ণনা করেছেন যতটা না বাস্তবতা থেকে তার চেয়ে বেশি ধারণা গ্রহণ করেছেন ম্যাক্স মুলার, রেনান, চার্লস টেম্পল এমন কি ডারউইন থেকে।
- আমরা আরো ধর্তব্যের মধ্যে নেবো যে সকল জাতিগোণ্ঠীর ‘পরিচিতি’ জ্ঞাপনের জন্য ‘সংস্কৃতি’র প্রয়োজন নেই।

অ্যান্টিকালচারালিজমতত্ত্ব কী?

এই তত্ত্ব দাবি করে যে জাতিগোষ্ঠী সম্পর্কে ‘সংস্কৃতি’ শব্দটির প্রয়োগই অর্থহীন। শুধু শ্বেতাঙ্গদের সঙ্গে অধিকৃত দেশের আদি অধিবাসীদের সংস্কৃতি নয়, যে কোনো বিশেষ জাতিগোষ্ঠীর তা সে স্বদেশেই হোক বা অভিবাসিত অবস্থাতেই হোক, ‘সংস্কৃতি’ কী সেটা একইভাবে সমস্যাপূর্ণ হয়ে ওঠে। বৃহত্তর বলয়ের অভ্যন্তরে অভিন্ন বস্তুর অবস্থান থাকে না, সেখানে নানা বস্তুর, ভিন্ন প্রকৃতির ও চরিত্রের সমাহার হওয়াই স্বাভাবিক। আরও বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে সেই ভিন্ন সমাহারের মধ্যেও একাত্মতা নেই। সুতরাং বৃহত্তর বলয়ের মধ্যে একটিমাত্র ‘সংস্কৃতি’র ধারণার যেমন সমর্থনযোগ্যতা নেই, তেমনি একটি জাতিগোষ্ঠীর অভ্যন্তরে যে একটিমাত্র ‘সংস্কৃতি’ বিরাজমান হবে তারও নিশ্চয়তা নেই। 

এই বক্তব্য মেনে নিলে ‘সংস্কৃতি’র উপস্থিতিকেই অস্বীকার করা হয়। কিন্তু বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ‘সংস্কৃতি’ না মানলে তাদের মধ্যকার পার্থক্য নিরূপণ করা কঠিন হয়ে উঠবে, কে উচ্চ অবস্থানে থাকবে তা শক্তি দিয়ে নির্ণীত হলেও এই অবস্থান থেকে পরিত্রানের উপায় একটাই - সেটা হলো কোনো না কোনোভাবে এইসব জাতিগোষ্ঠীর ‘সংস্কৃতি’ উদ্ভাবন করা অথবা সামাজিকভাবে সৃষ্টি করা। সেটা করতে গেলে যে ক্রমান্বয় পদক্ষেপ বা কর্মপদ্ধতির প্রয়োজন তা বিশ্বে এখন সহজলভ্য করে তোলা হয়েছে। প্রথম পদক্ষেপ হচ্ছে একটা জাতি বা গোষ্ঠীকে উৎকৃষ্টকরণ বা নিকৃষ্টকরণ প্রক্রিয়ার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা; দ্বিতীয়, সেটার একটা শব্দগত পরিচিতি (vocally articulated identity) সৃষ্টি করা, কিংবা তেমন পরিচিতিতে আগ্রহান্বিত করা; তৃতীয়, সেই পরিচিতি সর্বজনীনভাবে গৃহীত করা; চতুর্থ, বুদ্ধিজীবীদের (গ্রামশি কর্তৃক ব্যাখ্যায়িত বুদ্ধিজীবী) সাহায্যে সেই পরিচিতিকে সেই জাতির বা গোষ্ঠীর বৈশিষ্ট্য হিসেবে স্থায়ীভাবে উপস্থাপন করা। 

কৃত্রিমভাবেই কি সকল নৃ-গোষ্ঠীর পরিচিতি সৃষ্ট হয়েছে?

উপরে বর্ণিত পরিকল্পনা করে বিভিন্ন নৃ-গোষ্ঠীর পরিচিতি তৈরির চেষ্টা অবশ্যই করা হয়েছে, তবে সেটা পুরোপুরি সফল হয়েছে তা বলা যায় না। সকল নৃ-গোষ্ঠীর পরিচিতি স্বাভাবিক ও প্রকৃতিসিদ্ধ। তাদের ভাষা, জীবনযাপনের কৌশল (পোশাক-পরিচ্ছদসহ), আচারবিচার, সামাজিক কর্মকা-, বিশ্বাস, অতীতের স্মৃতি, লোকগাথা, ইত্যাদি এক এক নৃ-গোষ্ঠীর বিশেষ নামের মধ্যে দিয়ে প্রকাশ পায়। সমস্যা হচ্ছে একটি মাত্র নৃ-গোষ্ঠী কোথাও একটা রাষ্ট্র সৃষ্টি করে নেই। অনেক সম্ভাবনার মধ্যে থাকতে পারে একটি নৃ-গোষ্ঠী একটি দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ ও তারা সে দেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নিয়ে আছে (সরকারি বা বিরোধীদল উভয়েই সেই সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের)। সে দেশের সংখ্যালঘু নৃ-গোষ্ঠীর রাষ্ট্রীয় পরিচয় সংখ্যাগরিষ্ঠদের যা সেটা হলেও তাদের সংস্কৃতিগত পরিচয় ভিন্ন।

ফ্রান্ৎয ফ্যানন একটি জনগাষ্ঠীর শেকড়উদ্ভূত স্বাভাবিক ও প্রকৃতিসিদ্ধ সংস্কৃতি সম্পর্কে একটা পরিপক্ব বক্তব্য রেখেছেন যে, কেউই তাঁদের আদি সংস্কৃতিকে ফেলে দিতে চান না - তাঁদের কাছে সেটা ঐতিহ্য এবং ইতিহাস। তাঁরা অবশ্য অতীতের সেই সাংস্কৃতিক পরিচিতির বদ্ধমূলতা বা নিশ্চলতা এবং মাত্রাতিরিক্ত ভালোবাসা যে বাহিরের জগৎ থেকে বিপদ ডেকে আনে সেটা সম্পর্কে সচেতন থাকেন না। (Fanon 1967)

নিজ দেশের বাইরে অন্য দেশে সংখ্যালঘু গোষ্ঠী হিসেবে বসবাস করা ব্যক্তিবর্গ হয়তো তাদের আদি পরিচিতি নিয়ে দুঃশ্চিন্তায় নেই, কিন্তু সম্ভাবনা থেকে যায় যে সেই পরিচিতির জন্যই তারা অবদমিত রয়ে যায় এবং রাষ্ট্রের পূর্ণ সুযোগসুবিধা তাদের দেওয়া হয় না। সংখ্যাগরিষ্ঠ কর্তৃক তাদের পূর্ণ সুযোগসুবিধা না দেওয়াকে ‘ন্যায্য’ করে তোলার জন্য সংখ্যালঘুদের বিশেষ পরিচিতি তৈরি করার ব্যবস্থা রাখা বাঞ্ছনীয়, যেমন এদের শিক্ষাদীক্ষা কম, থাকলেও তা মানসম্মত নয়, তারা কর্মবিমুখ, তাদের আচারব্যবহার সহকর্মীদের সঙ্গে মিশ খায় না, ইত্যাদি। এই উদ্ভাবিত ও আরোপিত পরিচিতিগুলো কালক্রমে তাদের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে গণ্য হতে শুরু করে। সময়ের পরিবর্তনের সাথে ও বৈশ্বিক ব্যবস্থার পরিবর্তনে অথবা নতুন জনসংখ্যান (ফবসড়মৎধঢ়যরপধষ) পরিস্থিতিতে তাদের পরিচিতি পরিবর্তিত হতে থাকলেও সেটা ধর্তব্যের মধ্যে নেওয়া হয় না। পরিচিতিগুলো কালক্রমে এতই দৃঢ়ভাবে গৃহীত হয়ে ওঠে যে সেসবে বিশ্বাস করে অবদমিত জনগোষ্ঠীকে বিশেষ সহায়তা, বিশেষত মাল্টিকালচারালিজম নীতির মাধ্যমে, প্রদান করার আন্দোলন হয়। মনে রাখতে হবে আপাতদৃষ্টিতে এ্ই আন্দোলনের উদ্দেশ্য ভালো হলেও, এ ধরনের কার্যকলাপ অবদমিত জনগোষ্ঠীকে উদ্ধার করে না, বরঞ্চ তাদের অবদমিত পরিচিতি স্থায়ী করে তোলে। এমন কি উন্নতমনা বলে পরিচিত পাশ্চাত্যের বাম দলগুলিও এই বিশেষ সহায়তার পক্ষে কাজ করে, যেমন ১৯৮০ সনের পূর্বে ব্রিটেনের লেবার পার্টি ও ১৯৯০ পর্যন্ত ‘দি নিউ লেফট’ দল।

অভিসন্ধিমূলকভাবে আনা কয়েকটি তত্ত্ব সম্পর্কে বর্তমান রচনায় স্থানাভাবে এবং এগুলো প্রথম দুই ধারার বিধায় আমি বিশ্লেষণ করা থেকে বিরত রইলাম - সেগুলো হচ্ছে আরোপিত পরিচিতিতত্ত্ব ascriptive identity theory, অপরিহার্য পরিচয় তত্ত্ব বা essential identity theory এবং বহুসংস্কৃতিততত্ত্ব বা multiculturalism।

অ্যান্টিকালচারালিজমের প্রধান পাঁচটি তাত্ত্বিক ভিত্তি

আমরা এখানে অ্যান্টিকালচারালিজমের পাঁচটি তাত্ত্বিক ভিত্তি বিশেষভাবে উল্লেখ করবো। তত্ত্বগুলোর ইংরেজি নাম ও বাংলা পরিভাষা এইরূপ: অ্যামবিভালেন্স বা বৈপরীত্যতত্ত্ব, হাইব্রিটি থিয়োরি বা সঙ্কর তত্ত্ব, ক্রেয়োলনেস (বাংলা পেলাম না), মিমিক্রি বা অনুকরণ, অনুকৃতি, অপরের সাদৃশ্য গ্রহণ সংক্রান্ত তত্ত্ব, এবং থার্ড স্পেস বা  তৃতীয় মহাজাগতিক আধার/স্পেস তত্ত্ব। এই তাত্ত্বিক ভিত্তিগুলোতে ব্যবহৃত ভাষা বিশেষ অর্থে একটি উপনিবেশের বা উপনিবেশ-মুক্ত দেশের জনগণ কীভাবে ঔপনিবেশিক শক্তির প্রয়োগ প্রতিহত করে সেটাই বর্ণনা করে। হোমি কে ভাভা এই বিষয়টি বিগত শতকের শেষ পর্যায়ে শিক্ষায়তনিক জগতে নিয়ে আসেন। তবে ভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে ও পটভূমিতে এই তত্ত্বগুলোর উৎপত্তি অনেক আগের, এবং কিছু তত্ত্ব উত্তর-ঔপনিবেশিক (পোস্টকলোনিয়াল) আলোচনাউদ্ভূত।
 
বৈপরীত্যতত্ত্ব বা বিপরীত অনুভূতিতত্ত্ব (ধসনরাধষবহপব ঃযবড়ৎু) – মূল তত্ত্ব উদ্ভাবক মনোবৈজ্ঞানিক ইউজেন ব্লিউলার। তিনি এই তত্ত্ব প্রথম প্রদান করেছিলেন ১৯১০ সনে।। ১৯১৬ সনে বই আকারে প্রথম প্রকাশ। হোমি কে ভাভা প্রায় ১০০ বছর পরে এটাকে অ্যান্টিকালচারালিজম তত্ত্বের সঙ্গে সম্পৃক্ত করেন। 

উত্তর-ঔপনিবেশিকতায় এই তত্ত্ব এসেছে উপনিবেশিক শক্তির দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। উপনিবেশিক শক্তি অবদমিত দেশগুলোর জনগণকে সুবিধা মতো একটা বাধা ছাঁচে ফেলে তাদের নি¤œমানের ও নিম্ন প্রকৃতির মানুষ হিসেবে মনে করে। এই ছবিটি তাদের কাছে অবিচল থাকাতে সেটার বিপরীত দিকটা তারা দেখতে অপারগ, অর্থাৎ উপনিবেশিক শক্তি অপর দিকটা দেখতে পারে না। কিন্তু অবদমিত জনগোষ্ঠী সেটা দেখতে পারে এবং তারা তাদের ওপর আরোপিত নিকৃষ্টতাব্যঞ্জক পরিচিতি প্রত্যাখ্যান করে উপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে সেই বিপরীত দিকটা নিয়ে সংগ্রামে নামে। এই তত্ত্ব অনুযায়ী ‘সংস্কৃতি’তেও পরস্পর বিরোধী ধারণা ও মাত্রা সন্নিহিত থাকে। হোমি ভাভার মতে এই দ্বৈততার ও বৈপরীত্যের উপলব্ধি থেকে অবদমিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে নিজেদের সংস্কৃতির পরিচিতি পূর্বে যা ছিল সেটা আর সেই রূপ ধারণ করে থাকে না।

সঙ্করতত্ত্ব (ঐুনৎরফরঃু ঃযবড়ৎু) - উত্তর-ঔপনিবেশিক তত্ত্বের সাথে জড়িত এই তত্ত্ব উদ্ভাবক এডওয়ার্ড ডব্লিউ সাঈদ। এই তত্ত্ব আধুনিক ও উত্তর-আধুনিক সময়ে বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন জাতির গণমানুষের চলাচল যে পরিস্থিতি সৃষ্টি করে সেটার তত্ত্বগত ব্যাখ্যা। হোমি কে ভাভা মাত্র দশ বছর আগে এটাকে কিছুটা পরিবর্তন করে অ্যান্টিকালচারালিজম তত্ত্বের সঙ্গে সম্পৃক্ত করেন। হোমি কে ভাভা যুক্তি দিয়েছেন যে বর্তমান বৈশ্বিক জনসংখ্যান পরিস্থিতিতে এক একটি সংস্কৃতি তাদের কিনারায় বা প্রান্তিকে এসে ভিন্ন সংস্কৃতির সংস্পর্শে ও সংঘর্ষে আসে। এই পরিস্থিতিতে অনেক বিরোধিতাপূর্ণ বৈশিষ্ট্য সামনে চলে আসে। এই বিরোধিতাপূর্ণ বৈশিষ্ট্যের মধ্যে থাকে একটি সংস্কৃতির অতীত-বর্তমান, বা ভেতর-বাহির, বা সমাজের অন্তর্গত-বহির্ভূত বিষয়গুলো। এই অবস্থা ও বিরোধিতাপূর্ণ উপাদানের সংস্পর্শ ও সংঘাতের কারণে অতীতের লালন করা সংস্কৃতি অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। ফলে, এতদিন যে সব উপাদান ধর্তব্যে নিয়ে, যেমন জাতি বা শ্রেণী বা গোষ্ঠী বা আদি বাসিন্দা হিসেবে একটি জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি ভিন্ন বলে মানা হতো, নতুন অবস্থায় অন্যান্য সংস্কৃতির সংস্পর্শে ও সংঘর্ষে আরো উপাদানের সঙ্গে মিশে সেই সংস্কৃতি সঙ্করত্ব অর্জন করে। শুধুমাত্র যে অভিবাসিত জনগোষ্ঠী সম্পর্কে সঙ্করতত্ত্ব প্রযোজ্য তা নয়, অতীতের উপনিবেশ দেশগুলো (এখন স্বাধীন) থেকে অভিবাসন ‘না করা’ জনগোষ্ঠী সম্পর্কেও প্রযোজ্য।

ক্রেয়োলনেসত্বের দাবি Ñ একসময়ের ক্রীতদাস প্রথায় আফ্রিকা থেকে জোরপূর্বক আমেরিকা এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজ দ্বীপপুঞ্জে নিয়ে যাওয়া কৃষ্ণাজ্ঞ ব্যক্তিরা ক্রেয়োল পরিচিতি দাবি করে। অভিধানিকভাবে ক্রেয়োল শব্দটির একটি অর্থ হচ্ছে

‘ধ ঢ়বৎংড়হ ড়ভ সরীবফ ঊঁৎড়ঢ়বধহ ধহফ অভৎরপধহ ৎধপব, বংঢ়বপরধষষু ড়হব যিড় ষরাবং রহ ঃযব ডবংঃ ওহফরবং’ ইউরোপিয়ান এবং অফ্রিকান জাতির মিশ্রতায় জন্ম হওয়া ব্যক্তি, বিশেষত, যারা ওয়েস্ট ইন্ডিজ দ্বীপপুঞ্জে বাস করে। (ঙীভড়ৎফ আধহপবফ খবধৎহবৎ’ং উরপঃরড়হধৎু, ৭ঃয বফ, ২০০৫)

এভাবে মিশ্র জাতিবর্ণের ব্যক্তিরা দাবি করে যে তাদের ইউরোপিয়ান, বা আফ্রিকান বা এশিয়ান নামে ডাকা যাবে না, কারণ অনেক দীর্ঘ ও কঠোর সময় পার করে যে প্রজন্ম আমেরিকায় বসবাস করছে তারা অতীতে ক্যারিবিয়ান, ইউরোপিয়ান, আফ্রিকান, হিসপানিক, এশিয়ান এমন কি ল্যাভান্টাইন (আরব মধ্যপ্রাচ্যের) দেশ থেকে অনেক পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া বা মিথস্ক্রিয়া ও অনেক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে (সঙ্করত্বও একটা প্রক্রিয়া অবশ্যই) বর্তমানে একটা সমষ্টিগত রূপ লাভ করেছে। এই জনগোষ্ঠীকে অতীতের বিশিষ্টতায় ভূষিত করা যায় না। এরা নতুন বিশিষ্টতা ও পরিচিতি লাভ করেছে। ক্রেয়োলনেস শক্তিশালী রাষ্ট্র বা কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অবদমিত জনগোষ্ঠীকে তাদের ইচ্ছামত (ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত) পরিচিতি প্রদানের রাজনীতি প্রত্যাখ্যান করে।
 
 মিমিক্রি তত্ত্ব বা অপরের সাদৃশ্য গ্রহণ বা অনুকরণ (গরসরপৎু) Ñ কোনো বস্তু বা জিনিষের আসল নাম না বলে অন্যভাবে উল্লেখ করে আসল বস্তুটির উপস্থিতি প্রদর্শন (সবঃড়হুস ড়ভ ঢ়ৎবংবহপব) করার একটা কৌশল আছে। এটা একটা উত্তর-ঔপনিবেশিক তত্ত্ব হিসেবে গৃহীত হয়েছে। এতে একটি উপনিবেশের অবদমিত জনগোষ্ঠী ঔপনিবেশিক শক্তির ভেক ধরে বা অনুকরণ করে বা তাদের জীবনযাত্রার সঙ্গে নিজেদের মিলিয়ে দিতে অগ্রসর হয়। ঔপনিবেশিক শক্তি চায় না ‘অন্যরা’ পুরোপুরি ‘আমাদের’ মতো হোক, তবে প্রায় কাছাকাছি হলে আপত্তির কিছু থাকে না। ক্ষমতাধর শক্তি তখন হয়তো বলবে, ‘বাহ, বেশ তো, আমাদের মতোই হচ্ছে, তবে পুরোটা কখনোই হবে না।’ জ্যাঁ লাকানের (অনেকে উচ্চারণ করেন লাকা) মতে এই অনুকরণের উদ্দেশ্য শত্রুকে ধোঁকা দেওয়া। অনেকে মনে করেন, এতে সেই ভূখ-ের পশ্চাৎপটের সঙ্গে ঔপনিবেশিক শক্তির সঙ্গে আদি জনগোষ্ঠীর সমন্বয়সাধন হয়, সেটা সঠিক ধারণা নয়। কারণ এই পশ্চাৎপটে এমন সব বিচিত্র রঙ-বেরঙ ছিটকে আছে যেটার জন্য সেখানে কোনো অর্থ বা নকশা, বা বোঝার মতো কাঠামো খুঁজে পাওয়া যায় না।

মিমিক্রি-তত্ত্ব দুইটি বাহ্যিক পরিচয় প্রকাশ করে, অর্থাৎ একই বস্তু বা ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে দুইভাবে উপস্থাপন করে। এই কৌশলে অবদমিত জনগোষ্ঠী শক্তিধারকদের ক্ষমতার কেন্দ্রের প্রতি দৃষ্টি হানে। একভাবে এটাকে ‘আমরা তোমাদেরই একজন’ হিসেবে ক্ষমতার ভাগিদার হওয়ার প্রচেষ্টা বলা যায়। হোমি ভাভার মতে মিমিক্রি একটা অনুপযোগী কৌশল, তবে এটা ক্ষমতার অধিকারী কর্তৃপক্ষের আসন্ন ভীতির কারণ হতে পারে। মিমিক্রি ঔপনিবেশিক আধিপত্যবাদী কৌশলী শক্তির কাছাকাছি থেকে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে। কাছাকাছি অবস্থানের জন্য এদের প্রতি ঔপনিবেশিক শক্তির ও সেই শক্তির প্রতি অবদমিত জনগোষ্ঠীর ওপর কড়া নজর রাখে। যেহেতু এই কৌশল ‘কমন সেন্স’ অস্বীকার ও নিয়মানুবর্তী আইনকানুনকে অমান্য করে, এটা একটি দেশে আইনশৃঙ্খলাকে বিব্রত করতে পারে।

মিমিক্রি-তত্ত্ব একটা মতানৈক্য সৃষ্টি বা আইন অমান্যকারী অবস্থান। এভাবে প্রজারা ঔপনিবেশিক শক্তির সাথে আংশিক উপস্থিতি সৃষ্টি করে যাতে ক্ষমতার ক্ষেত্রে প্রজাদের প্রতিনিধিত্ব থাকে। এই তত্ত্ব মেনে নিলে একটি জাতির বা গোষ্ঠীর সংস্কৃতির অনড়ত্ব তো নয়ই. সংস্কৃতির যে অবিনশ্বরতা বা শাশ্বত রূপের ধারণা আমাদের মনে গেঁথে দেওয়া হয়েছে সেটা আর যুক্তিসঙ্গত মনে হয় না। 

তৃতীয় মহাজাগতিক আধার/স্পেস তত্ত্ব (ঞযরৎফ ঝঢ়ধপব ঞ�