করোনাকাল
বিচ্ছিন্ন অনুভব
মাহফুজা হিলালী

প্রবন্ধ
অধ্যাপক আনিসুজ্জামান
শামসুজ্জামান খান

গল্প
ডায়মন্ড লেডি ও পাথর মানব
হামিদ কায়সার

গদ্য
নিদ্রা হরণ করেছিল যে বই
মিনার মনসুর

নিবন্ধ
পঞ্চকবির আসর
সায়কা শর্মিন

বিশ্বসাহিত্য
আইজাক আসিমভের সায়েন্স ফিকশন
অনুবাদ: সোহরাব সুমন

বিশেষ রচনা
প্রথম মহাকাব্যনায়ক গিলগামেশ
কামাল রাহমান

শ্রদ্ধাঞ্জলি
মুজিব জন্মশতবর্ষ
মারুফ রায়হান
 
সাক্ষাৎকার
কথাশিল্পী শওকত আলী

জীবনকথা
রাকীব হাসান

ভ্রমণ
ইম্ফলের দিনরাত্রি
হামিদ কায়সার

ইশতিয়াক আলম
শার্লক হোমস মিউজিয়াম

নিউইর্কের দিনলিপি
আহমাদ মাযহার

শিল্পকলা
রঙের সংগীত, মোমোর মাতিস
ইফতেখারুল ইসলাম

বইমেলার কড়চা
কামরুল হাসান

নাজিম হিকমাতের কবিতা
ভাবানুবাদ: খন্দকার ওমর আনোয়ার

উপন্যাস
আলথুসার
মাসরুর আরেফিন

এবং
কবিতা: করেনাদিনের চরণ

১৬ বর্ষ ০৯ সংখ্যা
এপ্রিল ২০২৪

লেখক-সংবাদ :





আমার মায়ের পৃথিবী
আনোয়ারা আজাদ
রোজার সময় খুব ভোরে বিছানার একপাশে বসে কোরান শরীফ পড়তেন মা। আমি ঘুমের ভান করে শুয়ে থেকে মার গুনগুনিয়ে পড়া শুনতাম। ঘুম থেকে ওঠানোর জন্য পড়তে পড়তেই মা বেশ কয়েকবার আমাকে ডাকতেন। মা কি পড়ছেন তার কিছুই বুঝতে না পারলেও সুরটা আমাকে মোহাচ্ছন্ন করে রাখতো। সেই থেকে সুরের প্রতি একটা মোহ তৈরি আমার। সুযোগ পেলেই গুনগুন করে সুর তুলি।
অনেক মানুষজন নিয়ে আমাদের পরিবার। বাবা ভীষণ ব্যস্ত থাকতেন তার পেশা নিয়ে। সব কিছুতেই টাইম মেইনটেইন করতেন, দশমিনিট এদিক ওদিক হতে পারতো না। সময়মতো তার খাবার দাবার রেডি করতে হতো আমার মাকে। না হলে আর খেতেনই না আমার রাগী বাবা। তার মাঝেও মাকে দেখেছি পাচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তে। কি করে উনি সব ম্যানেজ করতেন এখনও আমার মাথায় ঢোকে না। কিন্তু একটা বিষয় ভেবে আমি খুব অবাক হই উনি কখনো এ নিয়ে আমাদের সাথে কথা বলতেন না। উনার একটা বিষয় নিয়েই তখন ভাবনা ছিল আমরা পড়তে বসেছি কি না। রান্নাঘর থেকে আমাদের পড়ার গলার আওয়াজ পেতে চাইতেন শুধু, ব্যাস। কত মানুষ যে আমাদের বাড়িতে আসতো তখন তার ঠিক ছিল না। বাবার রুগি থেকে শুরু করে জমি থেকে আসা আধিয়ার, পাড়ার হিন্দু প্রতিবেশি, বিহারী প্রতিবেশি, কে নেই বলুন! সবার সাথেই এত্ত কাজের মধ্যেও আমার মায়ের হাসিমুখে কথা বলা। হিন্দু এক দিদি আসতেন বাড়িতে, আমার মাকে মা ডাকতেন, তিনিও মাথায় শাড়ি ঢেকেই আসতেন, কখনও মাথার কাপড় ফেলতে দেখিনি তাকে।  সামনের এক বাড়িতে এক কাকিমা সন্ধ্যায় পুজো করতেন, মা বলতেন, সন্ধ্যার সময় পুজোর সময়, বিরক্ত করতে যাবি না এখন। কাকাবাবু আমাদের বাড়ির মাংস রান্না পছন্দ করতেন, ঈদের সময় দুপুরের আগেই ঐ বাড়িতে খাসির কোরমা রান্না চলে যেত । পাশেই এক বিহারী পরিবার থাকতো, তাদের ছেলের বিয়েতে আমাদের বাড়ির খোলা জায়গাটায় তিনদিন ধরে কাওয়ালী পার্টি বসে কাওয়ালী গাইল, বুঝুন, আমরা কিরকম সেকুলার পরিবেশে মানুষ হয়েছি,? আর আমরা ছোটবেলায়তো পড়েছিই মিশনারী স্কুলে, সেখানে প্রতি রবিবারে গির্জায় ঢুকে দাঁড়িয়ে থাকতাম। ভালো লাগত। না কেউ বাধ্য করতো না আমাদের, কৌতূহল নিয়েই যেতাম। স্কুলের খ্রিষ্টান দিদিমনি মাঝে মাঝেই দুই বেনী দুলিয়ে চলে আসতেন আমাদের বাড়িতে। হেডস্যারকে বাবার কাছে আসতে দেখে ভয়ে পালিয়ে যেতাম। গির্জায় কি যেন একটা গান শেখাত, এখন ভুলে গেছি, গুনগুন করতাম তখন।
এক লোক, যাকে তেলী বলে জানতাম সপ্তাহে এসে সরিষার তেল দিয়ে যেত, তাকেও নাস্তা না খাইয়ে বিদেয় করতেন না আমার মা। কলের পাড়ে হাত মুখ ধুয়ে রান্নাঘরের বারান্দায় এক কোনে মোড়ায় বসে অপেক্ষা করতো। সেই তেলীও আমার মাকে মা ডাকতো । সেই লোক একদিন একটা লেবুর চারা এনে আমাদের বাড়ির পেছনের বাগানে লাগিয়ে দিয়ে গেল। অনেক বছর সেই গাছের লেবু খেয়েছে বাড়ির লোকজন। খুব সাধারণ করে কাপড় পরতেন আমার মা, মাথা শাড়ি দিয়েই ঢেকে রাখতেন। কোনো রকম সাজগোজ তো দূরের কথা। চুল বাঁধারই বোধহয় সময় পেতেন না। কিন্তু ঘরদোর অগোছালো থাকার কোনো উপায় ছিল না। এদিকে তার সজাগ চোখ ছিল। আলনা সব সময় পাটপাট থাকতো আমাদের। বেশি ভাইবোন বলে এলোমেলো  থাকার প্রশ্নই ছিল না। আমি যখন প্রথম স্টাইল করে শাড়ি পরা ধরলাম, দেখে মা আমার মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থেকে বললেন, কেন যে সবাই মেয়েটাকে কালো বলে পিছনে লেগে থাকে, খোঁচা দেয় ভালো বিয়ে হবে না বলে, দেখুকতো এখন একবার, কত্ত সুন্দর লাগছে। যা, তোর আব্বার সামনে দিয়ে একবার ঘুরে আয়। আমার এখনও কানে লেগে আছে কথাটা। আমার ধার্মিক মায়ের চোখে সেই স্টাইলে শাড়ি পরাটা খারাপ লাগেনি। তার মুগ্ধ চোখই বলে দিয়েছে সে কথা।
সন্ধ্যার আজান দেওয়ার সাথে সাথে নামাজে দাঁড়িয়ে যেতেন আমার মা। কখনও বলেননি তোরা এসে আমার সাথে দাঁড়া। এ নিয়ে আমার বাবার সাথেও কখনও বাড়াবাড়ি করতে দেখিনি। রোজার সময়ও  কখনও জোরাজুরি ছিল না। যার ইচ্ছা ভোরে উঠে গরম গরম ভাত খাও, যার ইচ্ছা না হয় সে সকালেই খেও। এটা নিয়ে সকালের পড়তে বসায় কেউ ফাঁকি দিতে পারবে না। আমাদের এগারো ভাইবোনের মধ্যে কেউ আন্ডারগ্রাজুয়েট থাকেনি। আমরা সব ভাইবোনেরা নামাজ কালাম পড়তে শিখেছিলাম। ছোট বেলায় আমরা ধর্মশিক্ষা বই থেকে কম বেশি সবাই আরবী পড়তে শিখেছিলাম, কোরান শরীফও অনেকেই খতম করতো তখন, কিন্তু আমি কেন জানি না বুঝে পড়তেই চাইতাম না, বলতাম, না বুঝে কানার মতো আমি পড়তে পারবো না। সত্যি পড়িনি। তবে পড়লাম বুঝে সুঝেই। অর্থাৎ মানে সহ তারপর পড়লাম। এবং সেটা অনেক বড় হয়ে। দেখলাম, আমার মায়ের যে জীবন দর্শন, যে নৈতিকতা, যে দিনযাপন, যে মানবিকতা তার সব কিছুরই ওখানে নির্দেশনা আছে। উনিতো কোনোটারই অর্থ জানতেন না, সুরা বাকারায় কী লেখা আছে জীবিত থাকাকালে বোঝার সুযোগই হয়নি, তাহলে?
ভেবে পেয়েছি এর উত্তর, সেটা হলো পারিবারিক শিক্ষা। সমাজের শিক্ষা। কম বেশি হলেও এরকমই চর্চা ছিল তখন। তাতে কি সমাজে কোনো বিশৃঙ্খলা ছিল? আজ যে অলিতে গলিতে এত মসজিদ এত হজে যাওয়া সব মানুষ, কিন্তু সেই নৈতিকতা কেন নেই? সেই সহাবস্থান কই এখন! সেই শিক্ষাগুলো বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে কেন? এই যে প্রতিবছর লাখ লাখ মানুষ হজ শেষে ঘরে ফিরছেন তারা যাওয়ার আগে কি সুরা বাকারা পড়ে যান না কিংবা এসেও কি ভালো মত পড়ে দেখার চেষ্টা করেন না? কী কী দিক নির্দেশনা দেয়া আছে সেখানে, আর কেনই বা সাফা মারওয়াতে দৌড়াদৌড়ি  করতে বলা হয়েছিল তাদের? তারা ফিরে আসার পর সে সব নিয়ে কখনোই আলাপ করতে দেখিনি। যে সব নিয়ে কথা বলতে দেখেছি, এসব সবই বাহ্যিক ব্যাপার, মূল কথাগুলো নিয়ে আলোচনা দূরে থাক, চর্চা করতেও দেখিনি।
আসলে আমি ঠিক জানি না তারা কোন জিনিষগুলো রপ্ত করতে চান! কিভাবে নিজেদের সন্তানদের পরিচালনা করতে চান। এত বিভাজন তৈরি হয়ে যাচ্ছে কেন তাহলে? এত সংঘর্ষ লেগে যাচ্ছে  কেন? কি শিক্ষায় শিক্ষত হতে যাচ্ছে পরের প্রজন্ম? কেন তারা অন্য ধর্মের মানুষকে মানুষ মনে করছে না।
্্এই সময়টাই কি তাহলে সঠিক? এতদিন যে শিক্ষা আমরা অর্জন করেছি সে সব কি তবে ভুল ছিল?
হারিয়ে যাওয়া চলে যাওয়া সেই সময়কার মানুষগুলোর জন্য খুব ভালো কোনো একটা জায়গা কি তাহলে অপেক্ষা করে নেই? এখন যে সমাজে বাস করছি আমরা, অনেকটাই অচেনা লাগে, কেউ কাউকে বিশ্বাস করতে পারছি না আমরা, খুব কাছের মানুষগুলোই কেমন জানি অচেনা হয়ে গেল। চিন্তা ভাবনায়, পোশাকে আশাকে, কথাবার্তায়, কেউ কাউকে চিনতে পারছি না। কি একটা ইজমের মধ্যে ডুবে আছে সবাই। আমার মায়ের সেই পৃথিবীটা কী তাহলে খুব একটা সভ্য ছিল না? এখন যে শিশুরা বড় হছে তাদের দেখা পৃথিবীটাই তবে সভ্যতার নিদর্শন?
না, এটাই সভ্যতা নয়। সভ্যতা তৈরি করার জন্য মানুষই এগিয়ে আসছে। সভ্যতা নতুন করে মানুষই রচনা করবে। ইস্তানবুলের বিখ্যাত হাজিয়া সোফিয়া মসজিদটিকে পুনর্নির্মাণ করার পরিকল্পনা করা হয়ে গেছে। এই মসজিদে খ্রিষ্টান ও মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের মানুষই উপাসনা করতে পারবে। ভাবা যায়? শুক্রবারে মুসলমানরা আর রবিবারে খ্রিষ্টানরা। সভ্যতা ঘুরে ঘুরেই আসবে, আর সবার ওপরেই থাকবে মানব জাতির কল্যাণময় সভ্যতা। আগামী দিনের শিশুদের জন্য আমরাই রেখে যাব সুন্দর একটা পৃথিবী। সব ধর্মের মানুষের হাতে হাত দিয়ে আমরাই এগিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেব।