করোনাকাল
বিচ্ছিন্ন অনুভব
মাহফুজা হিলালী

প্রবন্ধ
অধ্যাপক আনিসুজ্জামান
শামসুজ্জামান খান

গল্প
ডায়মন্ড লেডি ও পাথর মানব
হামিদ কায়সার

গদ্য
নিদ্রা হরণ করেছিল যে বই
মিনার মনসুর

নিবন্ধ
পঞ্চকবির আসর
সায়কা শর্মিন

বিশ্বসাহিত্য
আইজাক আসিমভের সায়েন্স ফিকশন
অনুবাদ: সোহরাব সুমন

বিশেষ রচনা
প্রথম মহাকাব্যনায়ক গিলগামেশ
কামাল রাহমান

শ্রদ্ধাঞ্জলি
মুজিব জন্মশতবর্ষ
মারুফ রায়হান
 
সাক্ষাৎকার
কথাশিল্পী শওকত আলী

জীবনকথা
রাকীব হাসান

ভ্রমণ
ইম্ফলের দিনরাত্রি
হামিদ কায়সার

ইশতিয়াক আলম
শার্লক হোমস মিউজিয়াম

নিউইর্কের দিনলিপি
আহমাদ মাযহার

শিল্পকলা
রঙের সংগীত, মোমোর মাতিস
ইফতেখারুল ইসলাম

বইমেলার কড়চা
কামরুল হাসান

নাজিম হিকমাতের কবিতা
ভাবানুবাদ: খন্দকার ওমর আনোয়ার

উপন্যাস
আলথুসার
মাসরুর আরেফিন

এবং
কবিতা: করেনাদিনের চরণ

১৬ বর্ষ ০৯ সংখ্যা
এপ্রিল ২০২৪

লেখক-সংবাদ :





রকের বিদ্রোহী রাজা নোবেল বিজয়ী বব ডিলান
ফারুক ওয়াহিদ
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু ও যোদ্ধা বব ডিলান- যিনি যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্য মিনেসোটার ডুলুথে ১৯৪১ সালের ২৪ মে জন্মগ্রহণ করেন। তার পূর্বপুরুষ ইউক্রেন থেকে অভিবাসিত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বসতি স্থাপন করেছিলেন। তার পুরো নাম রবার্ট অ্যালেন জিমারম্যান- তবে সঙ্গীত বিশ্বে বব ডিলান নামেই পরিচিত- বব ডিলান শুধু একটি নাম নয়- একটি প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। যেখানে অন্যায়-অবিচার-অত্যাচার সেখানেই প্রতিবাদী বব ডিলানের কণ্ঠ, গিটার ও হারমোনিকা ঝলসে উঠে অগ্নিস্ফূলিঙ্গ বের হয়। একাত্তরে বাংলাদেশে হানাদার বর্বর নরপশু পাকিস্তানিদের নির্বিচারে গণহত্যার খবর এই মানবতা দরদি কণ্ঠশিল্পী বব ডিলানের কানেও পৌঁছে যায় আরেক মানবতা দরদি বাংলাদেশের সুহৃদ কিংবদন্তি শিল্পী জর্জ হ্যারিসনের মাধ্যমে। একাত্তরে হানাদার নরপশু বর্বর পাকিস্তানি হায়েনাদের বিরুদ্ধে প্রাণপণে লড়াই করার জন্য আমরা হাতে তুলে নিয়েছিলাম অস্ত্র- আর বিশ্বনন্দিত জনপ্রিয় সুবিখ্যাত কণ্ঠশিল্পী, গীতিকার, সুরকার, কবি, লেখক চিত্রশিল্পী, ডিস্ক জকি ও অভিনেতা বব ডিলান নিয়েছিলেন গিটার ও হারমোনিকা- হাতে গিটার আর গলায় ঝোলানো হারমোনিকা ছিল তার বিশেষ পরিচিতি।
সঙ্গীতের প্রতি জিমের আকর্ষণ শুরু হয় ১১ বছর বয়সে পিয়ানো বাজানোর মধ্য দিয়ে। সঙ্গীত ক্যারিয়ারের সূচনা হয় ১৯৫৯ সালে মিনেসোটার এক কফি হাউসে। ১৯৬০ সালের শুরুতে জিম হাইস্কুল শেষ করে মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। এই বিশ্ববিদ্যালয়েই প্রথম গানের দল গড়ে তোলেন জিম, আর নিজেকে পরিচয় দিতে শুরু করেন বব ডিলান নামে। ওই সময়েই ডিলান অ্যাকুয়েস্টিক গিটার বাজিয়ে গাইতে শুরু করেন। ঠিকানা বদল করে তিনি ১৯৬১ সালে নিউইয়র্কে চলে যান এবং ২০ বছর বয়সে কলাম্বিয়া রেকর্ডসের সঙ্গে প্রথম চুক্তি করেন বব। কিন্তু আমেরিকান আইন অনুযায়ী নিজে নিজে অর্থাৎ একা কোন কিছুতে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার মতো বয়স নয় এটা। এ কারণে চুক্তিতে তার মা-বাবা কিংবা অভিভাবকের স্বাক্ষরও প্রয়োজন ছিল। কিন্তু তিনি তা চাননি- তাই সঙ্গীত প্রযোজক জন হ্যামন্ডকে বিশ্বাস করাতে সক্ষম হন তার মা-বাবা নেই এবং নিজেকে অনাথ পরিচয় দেন। ১৯৬২ সালে তার প্রথম অ্যালবাম বব ডিলান বাজারে আসে। বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে গানের টানেই ডিলান চলে আসেন নিউ জার্সিতে। তখন থেকেই ব্যতিক্রমি গায়কী আর হৃদয়গ্রাহী গানের কথায় সঙ্গীতাঙ্গনে প্রতিষ্ঠা পাওয়া শুরু। ডিলানের বেশকিছু গান যুদ্ধবিরোধী ও নাগরিক অধিকার আন্দোলনের হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল। গানগুলো দ্রোহ ও স্বাধীনতার ভাব বহন করে এবং এই গানগুলো যুদ্ধবিরোধী ও নাগরিক আন্দোলনের অনেক সংগঠন মর্ম সঙ্গীত হিসেবে ব্যবহার করে। গানের মধ্য দিয়ে দ্রোহ আর মানুষের অনুভূতি ফুটিয়ে তোলার জন্য ষাটের দশকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গীতাঙ্গনে ডিলান ছিলেন এক অবিসংবাদিত নাম।বব ডিলানের প্রকাশিত ৭০টি অ্যালবামের মধ্যে কিছু সংখ্যক অ্যালবামের শিরোনাম ও প্রকাশের সময়কাল হচ্ছেথ বব ডিলান (১৯৬২), দ্য ফ্রিউইলিন বব ডিলান (১৯৬৩), দ্য টাইম দে আর এ-চেনজিন (১৯৬৪), অ্যানাদার সাইড অফ বব ডিলান (১৯৬৪), ব্রিইংগিং ইট অল ব্যাক হোম (১৯৬৫), হাইওয়ে ৬১ (১৯৬৫), বেস্নানডি অন বেস্নানডি (১৯৬৬), বব ডিলানস গ্রেটেস্ট হিটস (১৯৬৭), জন ওয়েসলে হার্ডিং (১৯৬৭), ন্যাশভিল স্কাইলাইন (১৯৬৯), নিউ মর্নিং (১৯৭০), ডিলান (১৯৭৩), প্লেনেট ওয়েভস (১৯৭৪), বিফোর দ্য ফ্লাড (১৯৭৪), বস্নাড অন দ্য ট্রাকস (১৯৭৫), দ্য ব্যাসমেন্ট টেপস্ (১৯৭৫), ডেজায়ার (১৯৭৬), হার্ড রেইন (১৯৭৬), স্ট্রিট লিগাল (১৯৭৮), সেস্না ট্রেন কামিং (১৯৭৯), সর্ট অফ লাভ (১৯৮১), ইনফিলডস (১৯৮৩), রিয়েল লাইভ (১৯৮৪), অ্যাম্পায়ার বারলেকস (১৯৮৫), বায়োগ্রাফ (১৯৮৫), নক আউট লোডেড (১৯৮৬), ডাউন ইন দ্য গ্রোভ (১৯৮৮), ডিলান অ্যান্ড দ্য ডেড (১৯৮৯), অহ্ মারসি (১৯৮৯), আন্ডার দ্য রেড স্কাই (১৯৯০), দ্য বুটলেগ সিরিজ ভলিউম ১-৩ (১৯৯১), গুড এজ আই বিন টু ইউ (১৯৯২), দ্য থারটিথ অ্যানিভারসেরি কনসার্ট সেলিব্রেসান (১৯৯৩), ওয়ার্লড গোন রং (১৯৯৩), বব ডিলানস গ্রেটেস্ট হিটস ভলিয়ম থ্রি (১৯৯৪), টাইম আউট মাইন্ড (১৯৯৭), দ্য বুটলেগ সিরিজ ভলিয়ম ফোর: বব ডিলান লাইভ ১৯৬৬, দ্য রয়েল অ্যালবার্ট হল কনসার্ট (রিলিসড ইন ১৯৯৮), দ্য অ্যাসেনশিয়াল বব ডিলান (২০০০), লাভ অ্যান্ড থেপ্ট (২০০১), দ্য বুটলেগ সিরিজ ভলিয়ম ফাইভ : বব ডিলান লাইভ ১৯৭৫- দ্য রোলিং থান্ডার রিভিউ ইজ লাইভ অ্যালবাম বাই বব ডিলান- রিলিজড ইন ২০০২।, দ্য বেস্ট অব বব ডিলান (২০০৫), মোডেম টাইমস (২০০৬), টুগেদার থ্রেুা লাইফ (২০০৯), ক্রিসমাস ইন দ্য হার্ট (২০০৯), টেমপেস্ট (২০১২), দ্য বুটলেগ সিরিজ ভলিয়ম টেন: অ্যানাদার সেলফ পোট্রেইট ১৯৬৯-১৯৭১ (রিলিজড ২০১৩), দ্য বুটলেগ সিরিজ ভলিয়ম ইলেভেন: দ্য বেসমেন্ট টেপস কমপ্লিট (২০১৪), শ্যাডোজস ইন দ্য নাইট (২০১৫), দ্য বুটলেগ সিরিজ ভলিয়ম টুয়েলভ: দ্য কাটিং এজড ১৯৬৫-১৯৬৬ (রিলিজড ২০১৫), ফলেন অ্যাঞ্জেলস (২০১৬)।দুই বাংলার জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী কবীর সুমনের কণ্ঠে কতটা পথ পেরোলে তবে পথিক বলা যায় গানটি দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশে পরিবেশেন করা বব ডিলানের জনপ্রিয় গান হাউ মেনি রোডস মাস্ট আ ম্যান ওয়াক ডাউন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে সৃজিত গানটি বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে এবং সবার মুখে মুখে- কতটা পথ পেরোলে তবে পথিক বলা যায়/কতটা পথ পেরোলে পাখি জিরোবে তার ডানা/কতটা পরিচয়ের পর মানুষ চেনা যায়/প্রশ্নগুলো সহজ, আর উত্তরও তো জানা।/কত বছর পাহাড় বাঁচে ভেঙে যাবার আগে/কত বছর মানুষ বাঁচে পায়ে শিকল পড়ে/কবার তুমি অন্ধ সেজে থাকার অনুরাগে/বলবে তুমি দেখছিলে না তেমন ভালো করে/কত হাজার বারের পর আকাশ দেখা যাবে/কতটা কান পাতলে তবে কান্না শোনা যাবে/কত হাজার মরলে তবে মানবে তুমি শেষে/বড্ড বেশি মানুষ গেছে বানের জলে ভেসে।
গানই কবিতা- কবিতাই গান এবং গান-কবিতা উভয়ই সাহিত্য- সেটাই নতুন করে আবারও প্রমাণ হলো ২০১৬ খ্রিস্টাব্দের ১৩ অক্টোবর সুইডিশ একাডেমি ৭৫ বছর বয়স্ক বব ডিলানকে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার বিজয়ি হিসেবে ঘোষণা করে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গীত ঐতিহ্যে নতুন কাব্যিক ধারা সৃষ্টির স্বীকৃতি হিসেবে বব ডিলানকে এই পুরস্কারে ভূষিত করা হয় বলে জানিয়েছে রয়েল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস সুইডিশ অ্যাকাডেমি বলছে, অ্যামেরিকার সঙ্গীত ধারায় নতুন কাব্যিক দ্যোতনা সৃষ্টির জন্য রক, ফোক, কান্ট্রি মিউজিকের এই কিংবদন্তিকে নোবেল পুরস্কারের জন্য বেছে নেয়া হয়েছে। বব ডিলান পৃথিবীর প্রথম গীতিকার ও সঙ্গীত শিল্পী যিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন- তবে এখানে অবাক বা বিস্মিত হওয়ার কিছুই নেই- এই পুরস্কার তার অবদান ও কৃতিত্বের জন্য প্রাপ্য ছিল। তবে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির আগেই বব ডিলান বিশ্বজুড়ে অনেক পুরস্কার ও সম্মানে ভূষিত হয়েছেন- যার মধ্যে ১১টি গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড, একটি অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড এবং একটি গোল্ডেন গ্লোব অ্যাওয়ার্ড।১৯৯০ সালের জানুয়ারিতে বব ডিলানকে ফরাসি সংস্কৃতিমন্ত্রী জ্যাক ল্যাং কমান্ডার দ্যাস আর্টস অ্যাট দ্যাস লেটার্স উপাধিতে ভূষিত করেন। ২০০০ সালে রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব মিউজিক পুরস্কার পান। ২০০৭ সালে বব ডিলানকে সংস্কৃতিতে প্রিন্স অব অস্ট্রিয়াস পুরস্কার দেয়া হয়। ওয়ান্ডার্স বয়েজ চলচ্চিত্রে বব ডিলানের থিংকস হ্যাভ চেইঞ্জড গানটি ২০০১ সালে অস্কার জিতে নেয়। ২০০৮ সালে পুলিৎজার পুরস্কারের জুরি বোর্ড যুক্তরাষ্ট্রের সংস্কৃতিতে অবদানের জন্য তাকে বিশেষ সম্মাননা জানায়। সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের আগে সমপ্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বব ডিলানকে সর্বোচ্চ বেসামরিক পদক প্রেসিডেন্টশিয়াল মেডেল অব ফ্রিডম দিয়ে সম্মানিত করেছেন। তিনি কয়েকবার নোবেল সাহিত্য পুরস্কারের জন্য মনোনীত হলেও এ বছর সেই প্রত্যাশিত পুরস্কার হাতে এলো। বব ডিলানের এই পুরস্কারে আটলান্টিক পারের বাসিন্দা মার্কিনিদের পাশাপাশি বঙ্গোপসাগর পারের বাসিন্দা বাংলাদেশিদের মধ্যেও আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। ফোক রকের কথা বললেই বব ডিলানের নামটা সবার আগে চলে আসে- তাই বব ডিলানকে বলা হয় রকের বিদ্রোহী রাজা এবং জীবনমুখী গানের অন্যতম পথিকৃৎ। ১৯৬০-এর দশক থেকে পাঁচ দশকেরও অধিক সময় ধরে জনপ্রিয় ধারার মার্কিন সঙ্গীতের অন্যতম প্রধান পুরুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলেও বর্তমান প্রজন্মের কাছেও তিনি সমান জনপ্রিয় তার গানের কথা মূলত রাজনীতি, সমাজ, দর্শন ও সাহিত্যিক প্রভাবে প্রভাবিত। সঙ্গীত ধারা প্রসারের পাশাপাশি তিনি আমেরিকান লোকগীতি ও কান্ট্রি, ব্লুজ থেকে রক অ্যান্ড রোল, ইংলিশ, স্কটিশ, আইরিশ লোকগীতি, এমনকি জ্যাজ, ব্রডওয়ে, হার্ড রকও গেয়েছেন। বব ডিলানের গানের ডিস্ক বা রেকর্ড ১০ কোটিরও বেশি বিক্রি হয়েছে- যা সর্বকালের সব রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে। গানের সংগ্রহ, নিরীক্ষাধর্মী গদ্য কবিতা ও আত্মকথাসহ ইংরেজি ভাষায় তার গ্রন্থের সংখ্যা ৩০টি- আর প্রকাশিত গানের অ্যালবাম ৭০টি যা একজন শিল্পীর জীবনে অনেক বড় কিছু।বব ডিলানের নোবেল প্রাপ্তিতে অভিনন্দন জানিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা টুইটারে লিখেছেন, নোবেল জয়ের জন্য আমার অন্যতম প্রিয় কবি বব ডিলানকে অভিনন্দন। তিনিই এর যোগ্য।
বব ডিলানের নোবেল পাওয়া নিয়ে নিজের প্রতিক্রিয়া জানালেন আরেক কিংবদন্তি মানবতা দরদি ও প্রতিবাদী কণ্ঠশিল্পী জোয়ান বায়েজ। ফেসবুকে তিনি লিখেছেন, এটি ডিলানের অমরত্বের পথে আরেক পদক্ষেপ। শব্দদিয়ে তিনি যা তৈরি করেন, তা ছাপিয়ে ওঠার সুযোগ নেই।কোন কোন সাহিত্যিক ডিলানের নোবেল প্রাপ্তিতে নাখোশ হয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন, এ খবরও গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। জোয়ান বায়েজ সেই সমালোচনাকারীদের দলে যোগ দেননি। তিনি লিখেছেন, বিদ্রোহী, একাকি, যাকে নিয়ে কোন পূর্বধারণা করা যায় না, সে রকম একজন শিল্পীকেই খুব প্রয়োজন ছিল নোবেল পুরস্কারের। তার মতো গাইতে পছন্দ করেন, এমন মানুষ আর কেউ নেই। কেউ আর আসবেও না। তার কথায়, যেন বব ডিলান নোবেল নয়, নোবেলই তাকে পেল। জোয়ান বায়েজ লিখেছেন, ডিলান গত শতকের ষাটের দশক থেকেই নাম করেছিলেন এবং অনেক গান করেছেন। এমনকি নিজের সঙ্গে বব ডিলানের রোমান্টিক জুটির কথাও বলেছেন এই শিল্পী।বব ডিলান ১৯৬৬ সালে এক মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার পর লোকচক্ষুর আড়ালে ছিলেন প্রায় আট বছর। মন ভেঙে যাওয়া বব ডিলানকে মঞ্চে যিনি তাকে আবার ধীরে ধীরে ফিরিয়ে আনেন এবং উৎসাহ দিয়ে অভ্যস্ত করে তোলেন- তিনি হলেন আরেক অসামান্য শিল্পী, ডিলানের এক সময়ের বান্ধবী এবং সঙ্গীত জুটি জোয়ান বায়েজ। এখানে উল্লেখ্য যে একাত্তরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে জোয়ান বায়েজের সেই বিখ্যাত গান সং অব বাংলাদেশ বিশ্ববাসীর কাছে বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ এবং হানাদার বর্বর পাকিস্তানিদের অত্যাচারের বার্তা পৌঁছে দিয়েছিল তাই বব ডিলানের মতো জোয়াজ বায়েজ-ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন এবং বাঙালির হৃদয়ে চিরদিনের জন্য স্থান করে নিয়েছেন।মুক্তিযুদ্ধের সময় ১৯৭১ সালের ১ আগস্ট রোববার অপরাহ্নে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে জর্জ হ্যারিসনের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ৪০ হাজার দর্শকশ্রোতার উপস্থিতিতে ঐতিহাসিক দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে উপস্থিত হন প্রখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী বব ডিলান, এরিক ক্ল্যাপটন, রিংগো স্টার, বিলি প্রেস্টন, রিওন রাসেল, সারোদ শিল্পী ওস্তাদ আলী আকবর খান এবং প-িত রবি শংকর তো আছেনই। তবলায় ছিলেন ওস্তাদ আল্লারাখা খান আর তানপুরায় কমলা চক্রবর্তী। অনুষ্ঠানের শুরুতেই রবিশংকর বাংলাদেশের অবস্থার কথা সংক্ষেপে সবার কাছে তুলে ধরেন সংক্ষিপ্ত বক্তব্যের মাধ্যমে। প-িত রবিশঙ্কর বলেন, আমরা কোন রাজনীতি করতে আসিনি। আমরা শিল্পী। আমরা শুধু এই অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে একটি বার্তা পৌঁছে দিতে সমবেত হয়েছি। আমরা চাই আমাদের সঙ্গীত বাংলাদেশের মানুষদের তীব্র বেদনা ও মনোযন্ত্রণা অনুভব করতে আপনাদের সাহায্য করুক।হাজার হাজার দর্শক-শ্রোতা বিস্ময়াভিভূত হয়ে শুনছিলেন রবি শংকর ও জর্জ হ্যারিসনের কথা- জর্জ হ্যারিসন বাংলাদেশে পাকিস্তানিদের বর্বরতার কথা ব্যক্ত করার সময় একসময় আবেগাপ্লুত হয়ে ওঠেন- তার চোখ ছলছল করে উঠে এবং সেই মুহূর্তে উপস্থিত হলভর্তি দর্শক শ্রোতাদের মধ্যে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। কনসার্টে বেশিরভাগ গানই অর্থাৎ ৮টি গানই পরিবেশন করেন জর্জ হ্যারিসন। তার বিখ্যাত গানগুলো গাওয়ার পরই সবশেষে তার নিজের লেখা ও সুরে গেয়ে শোনান সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিখ্যাত বাংলা দেশ বাংলা দেশ গানটি। গানটি দর্শক-শ্রোতাদের কাছে বেশ জনপ্রিয়তা পায় এবং ৪০ হাজারেরও বেশি দর্শক দীর্ঘস্থায়ী তুমুল করতালির মাধ্যমে বর্বর পাকিস্তানিদের ধিক্কার জানিয়ে বাংলাদেশকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সমর্থন দিয়ে জর্জ হ্যারিসনকে বিপুলভাবে অভিনন্দন জানান। দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ-এর প্রধান আকর্ষণ ছিল এর নতুনত্ব ও স্বতঃস্ফূর্ততা। এই স্মরণীয় কনসার্ট জর্জ হ্যারিসনের সঙ্গীত জীবনে একটি মাইলফলক হয়ে আছে।দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশের বাড়তি আকর্ষণ ছিলেন বব ডিলান আর জর্জ হ্যারিসন। সে অনুষ্ঠানে বব ডিলান পাঁচটি গান গেয়েছিলেন। বব ডিলানের গিটারে বাজল বাংলাদেশের মুক্তির গান। বব ডিলানের জনপ্রিয় গানগুলো শুনতে পেরে দর্শক-শ্রোতাদের মধ্যে তুমুল মুক্তিকামী চেতনা এবং উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল।
এই অনুষ্ঠানের কনসার্টে বব ডিলান একে একে গেয়েছিলেন পাঁচটি গান- তার গানগুলো ছিল : (১) আ হার্ড রেইনস আ-গনা ফল, (২) ইট টেকস আ লট টু লাফ, ইট টেকস আ ট্রেন টু ক্রাই, (৩) বেস্নাইং ইন দ্য উইন্ড, (৪) মি. টাম্বুরিন ম্যান এবং (৫) জাস্ট লাইক আ ওম্যান। বেস্নাইং ইন দ্য উইন্ড গানটি ষাট দশকেই প্রতিবাদী করে তুলেছিল সারা পৃথিবীর মুক্তিকামী মানুষকে এবং এই গানটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে একাকার হয়ে যায়। বব ডিলানের ষাট দশকে রচিত তার গানগুলো সেই সময়ে আমেরিকান নাগরিক অধিকার আন্দোলনের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে এবং তিনি আমেরিকার অস্থিরতার প্রতীক বিবেচিত হতেন। এই কনসার্টের মধ্য দিয়েই দীর্ঘ আট বছর পর এটাই ছিল বব ডিলানের জনসমক্ষে প্রথম সঙ্গীত পরিবেশনা।প্রতিটি গানের সঙ্গে বব ডিলান অ্যাকুস্টিক গিটার ও হারমোনিকা বাজিয়েছিলেন। আর প্রতিটি গানের সঙ্গে জর্জ হ্যারিসন ইলেকট্রিক গিটার বাজান। বিটলসের আরেক সদস্য রিঙ্গো স্টার বাজিয়েছেন টাম্বুরিন। আর প্রতিটি গানের সঙ্গে সঙ্গী ছিলেন লিওন রাসেল। তবে বব ডিলানের শেষ গানটিতে কণ্ঠ দিয়ে সঙ্গী হয়েছিলেন জর্জ হ্যারিসন ও লিওন রাসেল। বব ডিলান এই কনসার্টে কোন পারিশ্রমিক নেননি- শুধু বব ডিলান কেন কোন শিল্পীই দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ সঙ্গীত অনুষ্ঠানে কোন পারিশ্রমিক নেননি- যেটা যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এই প্রথম। ব্রিটিশ কবি অ্যালেন গিনসবার্গের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ অবলম্বন করে লেখা বিখ্যাত ঐতিহাসিক কবিতা সেপ্টেম্বর অন যশোর রোডকে গানে রূপান্তরের পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করেন বব ডিলান। বব ডিলান এখনও লিখে চলেছেন মুক্তির গান এবং সেই সঙ্গে মঞ্চেও গাইছেন।এই বেনিফিট সঙ্গীত অনুষ্ঠান দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ থেকে সংগৃহীত হয়েছিল ইউএস ডলার ২,৪৩,৪১৮.৫০ (দুই লক্ষ তেতাল্লিশ হাজার চারশত আঠারো দশমিক পাঁচ ডলার)- যার পুরোটাই মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের জন্য ও ভারতে আশ্রয়প্রার্থী বাংলাদেশের অসহায় শরণার্থীদের জন্য দেয়া হয়েছিল। ১৯৭১-এ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জর্জ হ্যারিসনের এই প্রশংসিত সাহসী পদক্ষেপ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বহির্বিশ্বের জনমত গঠনে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল। কনসার্টের মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন সুরসম্রাট আলাউদ্দিন খাঁর শিষ্য- সুরলহরীর দেশ ঐতিহ্যবাহী ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জামাইবাবু ভারতরতœ বিখ্যাত সেতার শিল্পী প-িত রবিশংকর।১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে বিশ্বে সাড়া জাগানো দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ-এর আয়োজকদের রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি, কৃতজ্ঞতা ও সম্মননা দেয়ার জন্য গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের আশু সুদৃষ্টি আকর্ষণ করছি।মুক্তিযুদ্ধের সময় দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষদের বিশেষ করে মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করে ও আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়। বব ডিলানের হাউ মেনি রোডস মাস্ট অ্যা ম্যান গো ডাউন গানটি শোনার সঙ্গে সঙ্গে এখনও শরীর শিহরিত ও রোমাঞ্চিত হয়ে উঠে এবং আমরা ফিরে যাই মহান একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে। ৭১-এ হিংগ্র হায়েনা পাকিস্তানি সেনা বাহিনী যখন বাংলাদেশে গণহত্যা, নারীধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও লুণ্ঠনের উল্লাসে মেতে উঠেছিল- তখন জর্জ হ্যারিসনের হৃদয় কেঁপে উঠেছিল এবং তখন তিনি বাংলার স্বাধীনতাকামী, নিপীড়িত, শোষিত, লাঞ্ছিত মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন এবং বব ডিলানের মতো অন্যান্য বিখ্যাত শিল্পীরাও বাংলাদেশের মানুষের জন্য বিশ্ববাসীর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেছেন।২০১৬-তে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী একাত্তরের বন্ধু কিংবদন্তি বব ডিলানকে শুভকামনা ও ভালোবাসা জানিয়ে শ্রদ্ধাভরে গর্বের সঙ্গে স্মরণ করছি এবং রক্তিম অভিবাদন জানাচ্ছি- যিনি একাত্তরে চিরকৃতজ্ঞতার বন্ধনে আমাদের আবদ্ধ করেছেন। একই সঙ্গে স্মরণ করছি প-িত রবিশঙ্কর ও জর্জ হ্যারিসনকে- বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষের হৃদয়ে তারা অমর হয়ে আছেন এবং থাকবেন।
লেখক : যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী মুক্তিযোদ্ধা (২ নং সেক্টর বাঞ্ছারামপুর)