করোনাকাল
বিচ্ছিন্ন অনুভব
মাহফুজা হিলালী

প্রবন্ধ
অধ্যাপক আনিসুজ্জামান
শামসুজ্জামান খান

গল্প
ডায়মন্ড লেডি ও পাথর মানব
হামিদ কায়সার

গদ্য
নিদ্রা হরণ করেছিল যে বই
মিনার মনসুর

নিবন্ধ
পঞ্চকবির আসর
সায়কা শর্মিন

বিশ্বসাহিত্য
আইজাক আসিমভের সায়েন্স ফিকশন
অনুবাদ: সোহরাব সুমন

বিশেষ রচনা
প্রথম মহাকাব্যনায়ক গিলগামেশ
কামাল রাহমান

শ্রদ্ধাঞ্জলি
মুজিব জন্মশতবর্ষ
মারুফ রায়হান
 
সাক্ষাৎকার
কথাশিল্পী শওকত আলী

জীবনকথা
রাকীব হাসান

ভ্রমণ
ইম্ফলের দিনরাত্রি
হামিদ কায়সার

ইশতিয়াক আলম
শার্লক হোমস মিউজিয়াম

নিউইর্কের দিনলিপি
আহমাদ মাযহার

শিল্পকলা
রঙের সংগীত, মোমোর মাতিস
ইফতেখারুল ইসলাম

বইমেলার কড়চা
কামরুল হাসান

নাজিম হিকমাতের কবিতা
ভাবানুবাদ: খন্দকার ওমর আনোয়ার

উপন্যাস
আলথুসার
মাসরুর আরেফিন

এবং
কবিতা: করেনাদিনের চরণ

১৬ বর্ষ ০৯ সংখ্যা
এপ্রিল ২০২৪

লেখক-সংবাদ :





পাউলো কোয়েলো
সোহরাব সুমন
পাউলো কোয়েলোর বিখ্যাত উপন্যাস ইলেভেন মিনিটস। উপন্যাসটির কোন এক জায়গায় এর গল্পের নায়িকা মারিয়া, নিজের সম্পর্কে বলে, বিচক্ষণ চিন্তাগুলো সে খুব ভালোভাবে লিখতে সক্ষম হলেও, সে তার নিজস্ব পরামর্শ অনুসরণ করতে পুরোপুরি অক্ষম। লেখক হাইপ্রোফাইলকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে বলেন, কখনও কখনও আমারও এরকম হয়। তবে আমি যতটা সম্ভব আমার কথার কাছাকাছি থাকতে চেষ্টা করি, কারণ বেশীরভাগ সময় আমি নিজের জন্য লিখি। আমি কে তা ভালোভাবে দেখার জন্য আমি লিখি। নতুন একটি বই লিখা শেষ করি আর আমি বুঝতে পারি, মাই গড! এই জিনিসগুলো ওখানেই ছিল আর আমি ওগুলো আগে দেখতে পাইনি। ঠিক যেমন যীশু এক অন্ধকে সারিয়ে তোলার পর, সেই অন্ধ সিনাগগে গিয়ে বলল, সবাই দেখো তিনি আমাকে সারিয়ে তুলেছেন! তার কথা শুনে সবাই বলল, আরে এদিকে এসো! ওই লোক একটা ভ-, ওই লোক তো এক হাতুড়ে বৈদ্য। তখন সেরে ওঠা সেই অন্ধ সবাইকে বলল, তাতে আমার কিছু যায় আসে না। আমি অন্ধ ছিলাম আর এখন দেখতে পাচ্ছি। আমার নিজেরও সেই একই কথা। কখনও কখনও আমি নিজের সম্পর্কে অন্ধ থাকলেও জবাবটা আমার মনের মাঝে ঠিকই থাকে আর হঠাৎ-ই আমি তা দেখতে শুরু করি।
ইলেভেন মিনিটস উপন্যাসে পাউলো কোয়েলো ব্রাজিলের এক তরুণী পতিতার ধারাবাহিক অভিজ্ঞতা এবং যৌন অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তার আত্ম-উপলব্ধির দিকে যাত্রার কথা বর্ণনা করেছেন। উপন্যাসটি মূলত মারিয়ার গল্প। মারিয়া প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে আসা একজন ব্রাজিলীয়ান তরুণী। প্রথম প্রেমের নিষ্কলঙ্ক প্রত্যাখ্যানে তার মন ভেঙ্গে যায়। খুব কম বয়সেই সে ভাবতে শেখে সত্যিকারের ভালোবাসা সে কখনই পাবে না। তার বিশ^াস, ভালোবাসা এমনই ভয়ানক জিনিস যা তাকে ভোগাবে...। সে কাপড়ের দোকানে বিক্রয়কর্মীর কাজ করে। বিনোদনের খোঁজে সপ্তাহিক ছুটির দিন রাজধানী রিও ডি জেনিরো শহরে কাটায়। একবার সেখানকার কোপাকাবানা সৈকতে, এক সুইস ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা হয়। লোকটি তাকে সুইজারল্যান্ডের জেনেভা শহরের এক ক্যবারেতে ব্যালে ডান্সারের চাকুরির প্রস্তাব দেয়। শুরুতে তার কাছে সবকিছু রূপকথার গল্পের মতো মনে হয়। সে বিখ্যাত ও ভাগ্যবতী হবার স্বপ্ন দেখে। কিন্তু বাস্তবতা ছিল পুরোপুরি আলাদা। কিছুদিনের জন্য সে এক নাইট ক্লাবে কাজ করে। কিন্তু খুব শীঘ্র আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। একরাতে ক্লাব ম্যানেজারের সঙ্গে উতপ্ত বাকবিত-ার পর সে চাকুরী ছেড়ে দেয়। পরে মডেল হবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। হাতে টাকা না থাকায় একহাজার ফ্রাঙ্কসের বিনিময়ে এক আরবের সঙ্গে রাতকাটাতে রাজি হয়ে যায়। এরপর সে একজন যৌনকর্মী হবার সিদ্ধান্ত নেয় এবং জেনেভার কেন্দ্রস্থল, প্রমোদনগরী রুই দে বান এর এক পতিতালয়ে গিয়ে ওঠে। এভাবে মারিয়া বেশ্যাবৃত্তিতে জড়িয়ে যায়। তবে কাজটি সে খুব নিলজ্জভাবেই করে।
সেখানে নিয়া নামের এক পতিতার সঙ্গে তার বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। নতুন পেশা সম্পর্কে তার কাছ থেকে পরার্মশ নেয়। গণিকাগৃহের মালিক মিলানের কাছ থেকে ব্যবসার সব ধরনের কলা-কৌশল শেখার পর সে তার শরীর এবং মন দিয়ে চাকুরীতে প্রবেশ করে। ভালোবাসার সবগুলো দরজা বন্ধ হয়ে গেলেও একান্তে কেবল ডায়রিতে সে নিজেকে মেলে ধরে। খুব দ্রুত পুরোদমে সফলতা আর খ্যাতি অর্জনের পর সহকর্মীরা তাকে হিংসে করতে শুরু করে। এভাবে কয়েকমাসের মাথায় মারিয়া পরিপাটি একজন পেশাদার বারবণিতা হয়ে ওঠে। যে শুধু তার খদ্দেরদের মনই শমিত করে না, বরং তাদের সঙ্গে তাদের সমস্যা নিয়ে আলাপ করে তাদের মনও শীতল করে।
অবশেষে এক সুদর্শন তরুণ চিত্রশিল্পীর দেখাপাবার আগ পর্যন্ত, সব ধরনের রোমাঞ্চের পরও, যৌনতা ও ভালোবাসা তার কাছে রহস্যময়ই থেকে যায়। প্রেম সম্পর্কে তার হতাশা জনক দৃষ্টিভঙ্গি তাকে পরীক্ষার মুখোমুখি করে। ঘটনাক্রমে সে-ও ছিল তারই মতো পথভ্রষ্ট। যৌনতার পবিত্রতা আবিষ্কারের জন্য, মারিয়াকে সবার প্রথমে অবশ্যই নিজের সাথে বোঝাপরার একটি পথ খুঁজে নিতে হয়। নিজেকে আবিষ্কারের এই দুঃসাহসিক অভিযানে, নিজের খাতিরেই তাকে যৌনতৃপ্তির মত অন্ধকার পথ রেখে ভালোবোসার টানে পবিত্র যৌনতা বেছে নিতে হয়। আর এভাবে নিজস্ব অন্তর আলো অনুসন্ধান করতে গিয়ে সে তার সবকিছুকে ঝুঁকির মুখোমুখি করে।
তরুণ সুইস চিত্রকর, রালফের সঙ্গে দেখা হবার পর তার জগত পুরোপুরি উলটে যায়। রালফ তার অন্তর আলো দেখতে পায়। মারিয়া তৎক্ষণাৎ তার প্রেমে পড়ে সত্যিকারের ভালোবাসার অভিজ্ঞতা লাভ করে। এবার মারিয়া তার যৌন ফ্যান্টাসি আর রালফের প্রতি সত্যিকারের ভালোবাসার মাঝে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে। ঘটনাক্রমে সে রালফের স্মৃতি নিয়ে জেনেভা ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কারণ সে বুঝতে পারে তাদের মাঝে যোজন দূরত্ব। তবে ফিরে যাবার আগে, সে রালফের অবদমিত যৌন আগুন পুনরুদ্দীপ্ত করবার সিদ্ধান্ত নেয়। এবং তার কাছ থেকে পবিত্র যৌনতার প্রকৃতি সম্পর্কে জানতে পারে। যে যৌনতা সত্যিকারের ভালোবাসার সঙ্গে মিলিত হয়ে ভালোবাসার মানুষকে নিজের আত্মা সমর্পণ করে।
এই বইতে কোয়েলো যৌনতার পবিত্র স্বভাব এবং রতিক্রিয়ার স্থিতিকালের বর্ণনা তুলে ধরে দুধরনের পতিতাবৃত্তির কথা বলেছেন। টাকার জন্য পতিতাবৃত্তি এবং পবিত্র পতিতাবৃত্তি। সঙ্গে সরাসরি ধর্ষ-মর্ষকামের কথাও তুলে ধরেছেন।
নিজের ভেতরে এমন সুপ্ত গুপ্তধনের সন্ধান থেকেই লেখালেখি বা এটি কি কোনো শিল্প-কৌশল নাকি ভালোবাসার প্রসব এমন প্রশ্নে জবাবে হাইপ্রোফাইলের ব্রায়ান ড্রেপারকে তিনি বলেন, আমি বলবো আমরা যা যা করি ভালোবাসা এর সবই করতে সক্ষম। আপনার জীবনের যথার্থতা তুলে ধরতে পারে এমন কোনকিছুর কাছাকাছি হলে, হতে পারে তা বাগান করা, রান্নাবান্না, এমনকি টেক্সি চালানো যা কিছু আপনি ভালোবাসেন- যোগসূত্র হুবহু কিন্তু একই: ভালোবাসা। আমি মনে করি না একজন লেখক যে কারো চেয়ে সেরা। আপনি উৎসাহ নিয়ে যা কিছুই করেন না কেনো, বাস্তবে আপনি ঈশ^রেরই প্রকাশ।
এর পরের ধাপ হলো শিল্প-কৌশল রপ্ত করা। লেখার জন্য, প্রথমে আমাকে পড়তে হয়েছে। কোর্স বা ওয়ার্কশপ থেকে আপনি লেখালেখি শিখতে পারবেন না- ওসবে আমার বিশ^াস নেই। অন্যান্য লেখক, যারা তাদের মন, তাদের অভিজ্ঞতা, তাদের সবকিছু মানুষের কাছে প্রকাশ করতে চেষ্টা করেছে তাদের লেখা পড়ে আপনাকে শিখতে হবে কীভাবে লিখতে হয়। আমি কী নিয়ে লিখব? আমার মূল প্রশ্ন কী? আপনাকে তা বেছে নিতে হবে এবং তারপর আপনার নিজস্ব কৌশল তৈরি করে নিতে হবে। অন্যেরা যা করে ফেলেছে আপনাকে তা পুনরাবৃত্তি করলে চলবে না এই চিন্তা থেকে আপনাকে নূতন রীতির প্রচলন করতে হবে।
আমার ক্ষেত্রে, আমার প্রধান সমস্যা ছিল সহজিকরণ। আমি দুর্বোধ্য সব লেখকদের লেখা পড়ে অভ্যস্ত। কখনও কখনও আমি গল্পটা দাঁড় করাতে পারলেও ভাবি, হায় খোদা! এর সবই তো খুব জটিল হয়ে গেলো! কেনো এক পৃষ্ঠায়, এক প্যারাতেই সবটা লিখতে গেলোম। তাই কীভাবে কতটুকু বাদ দিতে হবে আমি তা শিখতে শুরু করি। এখন আমি তাই করছি। আমার যে কোনো বইয়ের চূড়ান্ত ভার্সন থেকে ওর খসড়া তিনগুণ বড় থাকে। অনেকটা নিজের মাংশ কেটে বাদ দেয়ার মতো হলেও, কাজটি করতে হয়।
পাউলো কোয়েলো দে সৌজা একাধারে একজন ব্রজিলিয়ান গীতিকার এবং ঔপন্যাসিক। উপন্যাস আলকেমিস্ট-এর জন্য তিনি সমধিক পরিচিত। এই উপন্যাসে তিনি প্রতীকের আশ্রয়ে অতীন্দ্রিয় উপকথার অবতারনা করলেও খুব সহজ ও সাবলীলভাষায় তা ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। নিজেকে আবিষ্কারের আত্মিক অনুসন্ধান মূলক সাহিত্যকর্মের জন্য তিনি ব্রাজিল এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যপকভাবে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। পর্তুগিজ ভাষায় লিখলেও, কোয়েলোর বই সমূহ বহু ভাষায় অনুদিত হয়েছে। ইলেক্ট্রোনিক মিডিয়ার একজন উৎসুক ব্যবহারকারী হিসেবে, একটি ভার্চুয়াল পাউলো কোয়েলো ফাউন্ডেশন গড়ে তুলতে ২০১৪ সালে তিনি তার ব্যক্তিগত লেখালেখিগুলো অনলাইনে আপলোড করেন।
নিজের এই আত্ম-অনুসন্ধান সম্পর্কে পাউলো বলেন, কখনও কখনও আমি আমার মূল প্রশ্ন নিয়ে লিখি। আর সেই আধ্যাত্মিক জগত আমাকে একজন আধ্যাত্মিক লেখকে পরিণত করতে পারে না। যুদ্ধ নিয়ে লিখে একজন জেনারেল হওয়া যায় না। গুপ্তচরবৃত্তি নিয়ে লিখে একজন গোয়েন্দা হওয়া যায় না। কিন্তু যখনই কাউকে একজন আত্মিক লেখক হিসেবে লেবেল লাগানো হবে, লোকে ভাববে তার কাছে কোনো জবাব অবশ্যই রয়েছে বা তার কোনো ভালো যোগাযোগ থাকবে... না! যদি এমন কোনো জিনিস থাকে আমি যা ঘৃণা করি তা হলো নতুন যুগ। আমার কাছে নতুন যুগের মানে হলো সব ধরনের ধর্মকে একত্রে গুলিয়ে ফেলা। যাদের একটি মাত্র ধর্ম অনুসরণের সাহস নেই সেই সব লোকেরাই এর ¯্রষ্টা।
তাই, আমি একজন ক্যাথলিক লেখক। আমি এমন একজন লেখক ঘটনাক্রমে যে ক্যাথলিক, তাই না? মাঝেমধ্যে আমি পুরোদমে পোপের বিরোধীতা করি। আমি আমার ধর্মের মিশনারিকে শ্রদ্ধা করি। কিন্তু বিভিন্ন বিশ^াসের লোকজনকে নিয়েও আমাকে আলোচনা করতে হয়। সবারই একটা আধ্যাত্মিক জগত রয়েছে তা ভাবতে আমি আমার ধর্মের বাইরে যেতে চাই।
কোয়েলো ১৯৪৭ সালের ২৪ আগস্ট ব্রাজিলের রাজধানী রিও ডি জেনিরো শহরে এক ক্যাথলিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ধর্ম ও বিশ^াসের প্রতি তার বাবা-মা ছিলেন খুবই অনুগত। তিনি জেস্যুইট স্কুলে লেখাপড়া করেন। কিশোর বেলা থেকেই তিনি একজন লেখক হবার স্বপ্ন দেখতেন। তার মাকে কথাটি বলার পর তিনি বলেন, প্রিয় আমার, তোমার বাবা একজন ইঞ্জিনিয়ার। তিনি একজন যুক্তিবাদী, ন্যায়সঙ্গত মানুষ। পৃথিবী সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি খুবই স্পষ্ট। তুমি কি সত্যিই বোঝ একজন লেখক হবার মানে আসলে কী?
সতের বছর বয়সে, কোয়েলোর অন্তর্মুখিতা ও সনাতন প্রথা অনুসরণে বিরোধীতা থেকে তার বাবা-মা তাকে মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভর্তি করতে বাধ্য হন। সেখানে তাকে ইলেক্ট্রোকনভালসিভ থেরাপি (ইসিটি) দেয়া হয়। বিশ বছর বয়সে নিষ্কৃতির আগ পর্যন্ত সেখান থেকে তিনি মোট তিনবার পালিয়ে আসেন। পরে এ নিয়ে কোয়েলোর মন্তব্য, এমন নয় যে তারা আমাকে আঘাত দিতে চেয়েছে, আসলে তারা জানতো না এ ধরনের পরিস্থিতিতে কী করতে হবে... তারা আমাকে ধ্বংস করে দেবার জন্য তা করেনি, তারা আমাকে রক্ষা করতেই এমনটা করেছে।
বাবা-মায়ের ইচ্ছেতে, কোয়েলো আইন বিদ্যালয়ে ভর্তি হয় এবং তার লেখালেখির স্বপ্ন ত্যাগ করে। মাত্র এক বছরের মাথায়, ১৯৭০ এ কেয়েলো আইন বিদ্যালয় থেকে ঝরে গিয়ে হিপ্পি জীবন যাপন শুরু করে। এ সময় তিনি দক্ষিণ আমেরিকা, উত্তর আমেরিকা এবং ইউরোপ ভ্রমণ করে, ও একই সঙ্গে মাদকে আসক্ত হন। ১৯৭২ এ ব্রাজিল ফিরে এসে তিনি বেশকিছু গান লিখে দেশজুড়ে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। এ সময় তিনি এলিইস হেজিনা, হিতা লী, এবং ব্রাজিলিয়ান আইকন আউ সেশ্যো-এর জন্য গান লিখেন। আউ-এর গান লিখতে গিয়ে কোয়েলো জাদু এবং অতিপ্রাকৃতের দিকে ঝুঁকে পড়েন। এক পর্যায়ে তার লেখা বেশকিছু গানে ‘নাশকতামূলক’ কথাবার্তা থাকার অভিযোগ ওঠে। এই অভিযোগে দুবছর পর কোয়েলো তার দেশের শাসক, সামরিক সরকার কর্তৃক গ্রেফতার হন। দশ বছর আগে ক্ষমতা দখলকারী সামরিক সরকার তার গান সমূহকে বামপন্থী ও বিপদজনক বলে গণ্য করে। গীতিকারের পেশা বেছে নেবার আগে কোয়েলো অভিনেতা, সাংবাদিকতা, ও থিয়েটার পরিচালকের কাজ করেন। মুক্তির পর তিনি ব্রাজিলের সিবিএস রেকর্ডস-এ রেকর্ডি এক্সিকিউটিভের কাজ নেন। ১৯৮০ সালে চাকরি হারাবার পর আবারও তার ভবঘুরে জীবন শুরু হয়।
এসময় কোয়েলো বিভিন্ন ধর্ম সম্পর্কে জানেন এবং তার লেখালেখির আগ্রহ নবায়ন করেন।
তরুণ বয়সে মানসিক আশ্রয় কেন্দ্রে এবং পরে গুপ্ত পুলিশি নির্যাতনের মুখোমুখি না হলে এখন যা করছেন তা নিঃশেষ হয়ে যেত কী-না, এমন এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, না। যীশুর জীবনের দিকে তাকান। তিনি তার জীবনের নিরানব্বইভাগ কাটিয়েছেন লোকজনের সঙ্গে কথা বলে, ঘুরে বেড়িয়ে, আর পান ভোজন করে। তারপর শেষ তিন দিন, আহ! এরপরই ক্রুশবিদ্ধ হয়ে মারা যান। তিনি কি এর আগে দুর্ভোগের শিকার হয়ে ছিলেন...? তার নিজস্ব অন্তর্দন্দ্ব ছিল, তাই না? তা নিয়ে কিন্তু কোনো কথা হয় না। কিন্তু... দুর্ভোগ আসলে গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়। আপনি কি তাই মরেন করেন?
আমাকে ‘ভুগতে’ হয়েছিল কারণ তা আমার সামনে পড়েছিল। বাস্তবে, পেছন ফিরে তাকালে আমার কাছে ওসব দুর্ভোগ বলে মনে হয় না। এসব আমার ভ্রমণের অংশ। এবং এসব আমাকে এখানে পৌঁছে দিয়েছে। এসব দুর্ভোগ না পোহাতে হলে, আমি কি এই একই সফল লেখক হতে পারতাম? সম্ভবত।
একই বছর কোয়েলো চিত্রকর ক্রিস্টিনা ওয়েটিসিকাকে বিয়ে করেন। আগে তারা একত্রে বছরের অর্ধেক রিও ডি জেনিরো এবং বাকী অর্ধেক ফ্রান্সের পিরেনিস পার্বত্য এলাকার পল্লী বাড়িতে থাকতেন। তবে বর্তমানে এই যুগল স্থায়ীভাবে সুইজারল্যান্ডের জেনেভা শহরে বসবাস করছেন।
১৯৮৬ সালে কোয়েলো উত্তর স্পেনের প্রাচীন সড়ক সান্তিয়াগো দে কম্পোসতেলার পথ ধরে পায়ে হেঁটে পাঁচশত মাইলেরও দীর্ঘ এক তীর্থযাত্রায় অংশ নেন। সেই ভ্রমণ ছিল মারাত্মক অস্বস্তিকর। ৫৬ দিনের এই তীর্থযাত্রায় কোয়েলো এমন এক আত্মিক উপলব্ধি লাভ করেন যা তার দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করা বেশীরভাগ কাজের মূল কাঠামো হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এ সব কথা তিনি তার আত্মচরিত দ্য পিলগ্রিমেজ-এ তুলে ধরেন। এক সাক্ষাতকারে কোয়েলো উল্লেখ করেন, (১৯৮৬ সালে), আমি যা করেছি তাতে ভীষণ সুখ পেয়েছিলাম। আমি এমন কিছু একটা করেছিলাম যা আমাকে খাবার আর পানি জুটিয়েছিল- দ্য আলকেমিস্ট-এ সেই একই রূপক ব্যবহার করে, আমি কাজ এগিয়ে নেই। আমার ভালোবাসার মানুষ ছিল। হাতে টাকা ছিল। কিন্তু তারপরও তখনও আমি আমার স্বপ্ন পুরো করতে পারছিলাম না। আমার লেখক হবার স্বপ্ন ছিল আর এখনও সেই স্বপ্ন আমি বয়ে বেড়াচ্ছি। এ সময় কোয়েলো তার গীতিকারের সেই লোভনীয় পেশা ছেড়ে পুরোদমে একজন লেখক হবার কাজে নিজেকে ন্যস্ত করেন। পাশাপাশি একই বছরে শিশু ও বৃদ্ধদের সহায়তার উদ্দেশ্যে তিনি পাউলো কোয়েলো ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেন।
তার বেস্ট সেলার দ্য আলকেমিস্ট লেখা শেষ হয় মাত্র ১৪ দিনের মাথায়। কারণ লেখাটি মনে মনে আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল? এমন এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ... আমার বিশ^াস আমাদের সবার মাঝেই প্রকাশিত হবার মতো একটি স্বর্গীয় স্ফুলিঙ্গ থাকে। এখানে এই পৃথিবীতে এটাই আমাদের কাজ। আমাদের মানবীয় গুণাবলী তা দাবী করে। যাতে আমরা নিজেদের যথার্থতা বুঝে উঠতে পারি। তাই, খুব ছোটবেলা থেকে আমি লেখক হবার স্বপ্ন দেখতে শুরু করি। আমি কালক্ষেপণ করেছি, কারণ আমি এখানকার যুক্তির মুখোমুখি হতে ভীত ছিলাম।
যখনই আমি আমার জাহাজগুলো পুড়িয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নেই এবং লিখতে শুরু করি, তখন আমার বয়স চল্লিশ। আমি দ্য পিলগ্রিমেজ-এ সান্তিয়াগো দে কম্পোসতেলার পথ ধরে হাঁটার প্রথম অভিজ্ঞতার কথা লিখে ফেলি। তারপর দ্বিতীয় বইতে, আমি আমার জীবনের রূপক লেখার সিদ্ধান্ত নেই। অবশ্য তখনও জানতাম না তা আমার মন ছুঁয়ে যাবে। তাই, আমার কাছে আলকেমিস্ট ছিল নিজেকে বোঝার জন্য অনেকটা পিছু ফিরে তাকিয়ে রূপকের আশ্রয়ে ভালো একটি গল্প খোঁজার মতো। আর এটি কাগজে নামিয়ে আনতে আমার দুসপ্তাহের মতো সময় দরকার হয়। কিন্তু বইটি অনেক আগে থেকেই এখানে ছিল, কারণ এটি ছিল আমার জীবনী।
এর কয়েকদিনের মধ্যে তিনি অ জিয়াদ্যু দে উম মাগু লিখেন। ১৯৯২ সালে দ্য ডায়রি অব আ মাগুস শিরোনামে এর ইংরেজি অনুবাদ ছাপা হয়। ১৯৯৫ সালে দ্য পিলগ্রিমেজ শিরোনামে উপন্যাসটি পুনরায় প্রকাশিত হয়। উপন্যাসটি তার এই ভ্রমণঅভিজ্ঞতার এক দার্শনিক বয়ান।
দ্য পিলগ্রিমেজ-এর কাহিনী অবলম্বনে কোয়েলোর জীবনীর নিয়ে একটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। ২০১৪ সালে মুক্তি পাওয়া ছায়াছবিটির আন্তর্জাতিক শিরোনাম নাও পারে না পিসতা। ব্রাজিলিয়ান প্রাক্তন ফুডবলার এবং কোচ ইভারিস্তো দে মাসিয়াদো এক টিভি সাক্ষাতকারে এ সম্পর্কে বলেন, সিনেমাটি আমাদেরকে এমন এক লোকের গল্প বলে যার একটি স্বপ্ন ছিল। এটি অনেকটা এলিস এন্ড ওয়ান্ডারল্যান্ডের মতো- তিনি এমন একজন ব্যক্তি যিনি ছিলেন তার ঘরের চেয়েও বড়।
১৯৮৮ সালে প্রকাশিত হয় তার কালজয়ী উপন্যাস অ আলকেমিস্তা। ১৯৯৩ সালে এর ইংরেজি অনুবাদ দ্য আলকেমিস্ট ছাপা হয়। এটি আন্দালুসিয়ান এক রাখাল বালকের গল্প। ছেলেটি মিশরের পিরামিডে গিয়ে গুপ্তধন সন্ধানের স্বপ্ন দেখে এবং তার পালের সব গবাদিপশু বিক্রি করে দেয়। এরপর আত্মবিশ^াসের সঙ্গে সেদিকে রওনা হয়। সারা পথে অন্তর্জ্ঞান তার সহযাত্রী। পার্থিব গুপ্তধনের সন্ধানে নেমে উপন্যাসের এই রাখাল বালক একপর্যায়ে তার মনের সমৃদ্ধি নিয়ে ফিরে আসে। প্রথমে অখ্যত এক ব্রাজিলিয়ান প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান বইটি ছাপার দায়িত্ব নেয়। ছোট্ট এই প্রতিষ্ঠান প্রাথমিকভাবে মাত্র ৯০০ কপি বই ছাপে, এবং বইটি আর পুনমুদ্রন করবে না বলে সিদ্ধান্ত নেয়। ঘটনাক্রমে কোয়েলো বড় পাবলিশিং হাউজ হার্পারকলিন্স-এর খোঁজ পান, এবং ১৯৯৪ সালে তার পরের বই ব্রিদাসহ, দ্য আলকেমিস্ট বৃহত্তর কলেবরে ছাপা হয়। পরবর্তীতে ইন্টারনেশনাল বেস্টসেলার তালিকায় ঠাঁই পায়। বইটি পঁয়ত্রিশটিরও বেশী দেশে বিক্রয় তালিকার শীর্ষে অবস্থান করে প্রকাশনা জগতে বড় ধরনের এক বিস্ময় সৃষ্টি করে।
তার লেখায় আলাদা সংস্কৃতি ও প্রচ্ছদপট তুলে ধরা সম্পর্কে তিনি বলেন, একজন লেখককে ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্ন প্রচ্ছদপট সম্পর্কে আগ্রহী হতে হয়। শুধু নিজের গ্রাম নিয়ে লিখবার জন্যই আমি এখানে আসিনি। নিজের গ্রামকে খানিকটা তুলে ধরলেও, আরসব গ্রামকেও বুঝতে হবে। টলস্টয়ও তাই বলে গেছেন- একটি গ্রামে যে সমস্ত ঘটনা ঘটে তা সব জায়গাতেই ঘটতে দেখা যায়।
১৯৮২ সালে, কোয়েলো তার প্রথম বই, হেল আরকাইভস, প্রকাশ করেন। যা উল্লেখযোগ্য প্রভাব সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয়। ১৯৮৬ সালে তিনি দ্য প্রাকটিক্যাল মেনুয়াল অব ভেম্পায়ারিজম লিখেন, যদিও তার কাছে বইটি ‘নি¤œ মানের’ মনে হওয়ায় তিনি তা বইয়ের তাকগুলো থেকে সরিয়ে নেবার চেষ্টা করেন।
কোয়েলোর বই সমূহে পুনরাবৃত্ত একটি ধারণা হলো ব্যক্তিগত উপাখ্যান। যেখানে চরিত্র সমূহ তাদের স্বপ্নগুলোকে অনুসরণ করে এবং স্বরূপ-আবিষ্কার পথের পিছু নেয়। সেই দীর্ঘ সব পথে তারা নানা দুর্ভোগের মুখোমুখি হলেও, কেবল নিজেদের স্বপ্নের কাছে বিশ^স্ত থেকে তারা আত্মিক পূর্ণতা অর্জন করতে পারে। তার সাহিত্যকর্ম সমূহে ধর্মীয় এবং দার্শনিক ধারণাগুলোর মিশ্রণ ঘটাতে কোয়েলো সহজ, সরল ও স্পষ্ট ভাষার ব্যবহার করেছেন।
বড় বড় লেখকদের সৃষ্টিকর্মে যাজকীয় কিছুই কি নেই? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, হেনরি মিলারের তা ছিল বলে কি আপনি মনে করেন? না! না! না! কিছু কিছু লেখক আছে যারা এটি করবার চেষ্টা করে, কিন্তু তারা ব্যর্থ হন। এসব ও ওসব শেখার চেষ্টা করতে আমি বই পড়িনা, কারণ, সপ্তাহের জন্য আমি শিখতে পারলেও এই সব শিক্ষা অদৃশ্য হয়ে যাবে। ঠিক নিজেকে সাহায্য করবার বইগুলোর মতো। ওগুলো পড়লেন আর ভাবলেন, এবার বোধহয় জীবনটা বদলে যাবে। কিন্তু সপ্তাহ খানেক পর একই ধরনের সব সমস্যার মোকাবেলা করতে হবে। তাই, লিখবার সময়, শেখাবার জন্য লিখলে চলবে না। লিখতে হবে শেখার জন্য।
এবং কাকে প্রভাবিত করতে যাচ্ছেন কখনই আপনি তাতে সচেতন নন। আমি বস্তুত বিটলস দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলাম। এর জন্য কি জন লেলন ও ম্যাকার্থির তারিফ বা দোষ দেয়া যেতে পারে? না। এমনকি আমার অস্তিত্বের কথাও তাদের জানা ছিল না। কিন্তু তাদের মাঝে ভাবনাটা ছিল আর প্রতি মূহুর্তে আমি যা ভাবছি তারাও তাই ভেবেছিলেন। আর সেই অনুভূতি বাস্তবেই এমন এক পার্থক্য তৈরি করে যে আমি মোটেই একা নই। সম্ভবত আমার বইয়ের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে। লেকেরা মনে করছে এই লেখক আমাদের মত একই জিনিস ভাবছেন আর তারা একা নন।
লেখক হয়ে ওঠার দীর্ঘসূত্রতা কাটিয়ে উঠবার চেষ্টায়রত থাকবার সময়, একবার কোয়েলোকে বলতে শোনা যায়, আজকে কোনো সাদাপালক দেখতে পেলে, বুঝব আমকে নতুন একটি বই লিখতে হবে ¯্রষ্টা আমার কাছে তারই একটি বার্তা পাঠিয়েছেন। তখনই কোয়েলো এক দোকানের জানালার ওপর ধবল একটি পালক দেখতে পান এবং সেদিনকার মতো লিখতে শুরু করে দেন। দ্য আলকেমিস্ট ছাপা হবার আগ পর্যন্ত, কোয়েলোকে সাধারণত প্রতি দুই বছরে অন্তত একটি করে উপন্যাস লিখতে হয়েছে। এর তিনটি- দ্য পিলগ্রিমেজ, দ্য ভালকিউরিস ও আলেফ- আত্মজৈবনিক। ১৯৯২ সালে, কোয়েলো এবং তার স্ত্রীর মরুভূমি এলাকায় অনুসন্ধানঅভিযান অনুসরণে ভ্রমণবৃত্তান্তের আঙ্গিকে লেখা ভালকিউইয়াস ছাপা হয়। ১৯৯৫ সালে, ভালকিউরিস শিরোনামে এর ইংরেজি অনুবাদ ছাপা হয়।
নিজেকে জাদু বাস্তবতার লেখক মনে করেন কী-না? তার বই সমূহ ম্যাজিকাল, তাহলে কেন তিনি দ্য পিলগ্রিমেজ ও ভালকিউরিসকে ননফিকশন বলছেন। তাতে করে কি তিনি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন না? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, ভালকিউরিস শতভাগ ননফিকশন নয়। তবে এর ননফিকশন চরিত্রের ওপরই গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। তিনি আরো বলেন, নিজেকে আমি কখনই ম্যাজিক রিয়ালিস্ট বলিনি। আমাকে আমি এমন একজন রিয়ালিস্ট বলেছি যে তার লেখার সাহায্যে ম্যাজিক স্পর্শ করেছে। প্রসঙ্গক্রমে আমাদের অগোচোরে অদৃশ্য কোনো বিশে^র অস্তিত্ব রয়েছে কী-না? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অবশ্যই। এখানে অদৃশ্য একটি জগত একেবারেই বর্তমান। উদাহরণ হিসেবে ভালোবাসা বা ভয় অথবা ক্ষোভের কথা বলা যেতে পারে। এরা অদৃশ্য হলেও এখানে অবস্থান করেই পকেটের টাকার চেয়েও জীবনকে অনেক বেশী প্রভাবিত করছে।
অন্যদিকে তার বাদবাকী বেশীরভাগ উপন্যাসই ফিকশনধর্মী। তার মক্তব, দ্য মেনুয়াল অব দ্য ওয়ারিয়র অব লাইট ও লাইক দ্য ফ্লোয়িং রিভার-এর মতো বইগুলো মূলত প্রবন্ধ সংগ্রহ, সংবাদপত্র কলাম অথবা নির্বাচিত বক্তব্য। এ যাবত তার লেখা ১৭০টিরও বেশী দেশে প্রকাশিত এবং আশিটি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এ পর্যন্ত তার বই একত্রে দশ কোটিরও বেশী সংখ্যাক কপি বিক্রি হয়েছে। ২০১৬ সালের ২২ ডিসেম্বর যুক্তরাজ্য ভিত্তিক কোম্পানি রিকটোপিয়া বিশে^র সবচেয়ে প্রভাবশালী সমকালীন লেখকদের তালিকায় কোয়েলোকে দ্বিতীয় স্থানে তালিকার্ভূক্ত করে।
তারপরও, বিতর্ক ছাড়া কখনই তার লেখার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত হতে দেখা যায়নি। ক্যাথলিক পরিবারে বেড়ে ওঠা এবং নিজেকে এখনও বিশ^াসী বলে উল্লেখ করবার পরও, তার লেখার মাঝে নতুন যুগের সর্বেশ^রবাদ ও আপেক্ষিকতাবাদী বিষয়বস্তুর কারণে তার বুদ্ধিজাত দৃষ্টিভঙ্গি ক্যাথলিক বিশ^াসের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন বলে মনে করা হয়। বিক্রি যাই হোক না কেনো, কোয়েলোর পরের কাজগুলোর রিভিউ সমূহতে সঙ্গত কারণেই এসবের অগভীরতার কথা উঠে আসতে দেখা যায়।
কোয়েলোর অন্যান্য গদ্যের মাঝে, না মাসান দ্যু রিও পিয়েদা ইউ সিনতেই এহ সোরে ছাপা হয় ১৯৯৪ সালে। ১৯৯৬ সালে বাই দ্য রিভার পিয়েদা আই স্যাট ডাউন এন্ড ওয়েপ্ট শিরোনামে এর ইংরেজি অনুবাদ ছাপা হয়। শারীরিক ও স্বর্গীয় ভালোবাসা এবং ঈশ^রের নারী অংশ এর বিষয়বস্তু। বাইবেলের নবী এলিয়াকে নিয়ে লেখা ঐতিহাসিক ফিকশন লা কিউতা মোন্তানিয়া। ১৯৯৮ সালে দ্য ফিফথ মাউন্টেন শিরোনামে এর ইংরেজি অনুবাদ ছাপা হয়। মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কোয়েলোর অভিজ্ঞতার আলোকে একই বছরে ছাপা আরো একটি উপন্যাসের নাম ভেরোনিকা দেসিদা মোহের। ১৯৯৯ সালে ভেরোনিকা ডিসাইড টু ডাই শিরোনামে এর ইংরেজি অনুবাদ ছাপা হয়। কাল্পনিক এক ছোট্ট শহরের ভালো-মন্দ নিয়ে লেখা উপন্যাস উ দেমনিয়া ই অ সিনিওরেত্তা প্রিম। ২০০০ সালে দ্য ডেভিল এন্ড মিস প্রিম শিরোনামে এর ইংরেজি অনুবাদ ছাপা হয়।
আপনি আপনার উপন্যাসে ‘শুভের লড়াই’ প্রসঙ্গে বলেছেন। আপনি কি মনে করেন আমরা শুভ বনাম অশুভের মতো কোনো মহাজাগতিক যুদ্ধে বিজড়িত রয়েছি? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সব সময়, হ্যাঁ। একেবারে শুরু থেকেই।... আমি সময়ে বিশ^াস করি না। আমার বিশ^াস পৃথিবী এখনই সৃষ্টি এবং ধ্বংস হচ্ছে। আমরা এই অনন্তে বসবাস করছি। বর্তমানে আমরা যা করছি তার সাহায্যে আমরা আমাদের অতীত ও ভবিষ্যত পুনরুদ্ধার করতে পারি। তাই, এখানে এমন একটি যুদ্ধ চলছে, তবে তা ¯্রষ্টার দ্বারা প্রস্তাবিত। আমি একজন একেশ^রবাদী। আমি বিশ^াস করিনা তার সমান ক্ষমতাধর অপর কোনো অশুভশক্তির অস্তিত্ব রয়েছে, কোনো অশুভ শক্তি শুভকে পরাজিত করতে পারে। তাই, এমন কতগুলো বিষয় এর সত্ত্বাধীন যার কোনো জবাব আমার কাছে নেই এবং আমি জবাব দেবার চেষ্টাও করি না।
সদাপ্রভুর প্রর্থনায় লেখা রয়েছে ‘আমাকে প্রলুব্ধ করো না!’ এর কি মানে? এর মানে হলো সব শেষে ঈশ^র আমাদের পরীক্ষা নিবেন। তখন একটি লড়াই হবে। তবে বসন্তের আগমনের সময় হলে আমি এই একই ধরনের লড়াই দেখতে পাই। আমার মনে হয় না তাতে শীত খুব খুশি হয়। সে থেকে যেতে চায়, কিন্তু বসন্ত বলে বেড়ায়- আমি আসছি। এর মাঝে জীবনের একটি চক্র রয়েছে, আমরা যা টেরপাই না। শরতে প্রকৃতির হাতে পাতা মরতে দেখে আমরা শিউরে উঠি। এটিই শুভ বনাম অশুভ। এটিই প্রকৃতি। আমাদের নিজেদের স্বভাবও কিন্তু এরকমই।
তাই, উচ্চাঙ্গ এসব সমস্যার কোনো জবাব আমার কাছে নেই। আমি কেবল আমার অনুভূতি প্রকাশ করতে পারি। এবং আমার অনুভূতি হলো- সেই রহস্যের সম্মান করা! জবাব খোঁজার চেষ্টা করবেন না। ভালো বক্তা হলে হয়তো এমন একটি উত্তর দাঁড় করানো সম্ভব যার সাহায্যে অসংখ্য লোককে বোঝানো যাবে, কিন্তু তা কি সততা হবে? এরকম কোন কাজ করা কি ঠিক হবে? বরং বলা ভালো- আমার জানা নেই। আমিও তাই করি।
কোয়েলো সপ্তাহে তিনবার তার ব্যক্তিগত ব্লগে পোস্ট করেন। ফেইসবুক ও টুইটারে তার লাখ লাখ ভক্ত রয়েছে। ২০১৪ সালের আগস্টে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের সঙ্গে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে তার ও তার ভক্ত-পাঠকদের সাথে তার সম্পর্ক তৈরি হবার বিষয়ে তিনি এক সংক্ষিপ্ত আলোচনায় অংশ নেন। একই বছর নভেম্বরের মাঝে তিনি তার সংগ্রহে থাকা নথি-পা-ুলিপি, দিনপঞ্জি, আলোকচিত্র, পাঠকদের চিঠি, সংবাদ বিজ্ঞপ্তির কর্তিতঅংশসহ মোট আশি হাজার পোস্ট সম্পন্ন করেন এবং একটি ভার্চুয়াল পাউলো কোয়েলো ফাউন্ডেশন গঠন করেন।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি একটি নতুন প্ল্যাটফর্ম। একজন লেখক হিসেবে আমাকে এমন সব প্ল্যাটফর্ম খুঁজে বের করতে হয় যা এই লিখন প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করা যাবে। ইন্টারনেট এর একটি। ইন্টারনেটের কারণে লোকেরা এখন আগের চেয়ে ঢের বেশী লিখছে ও পড়ছে। তাই আমার পাঠকদের কথা শুনবার জন্য এবং তাদের সাথে উভমুখি যোগাযোগ গড়ে তুলতে এই ভার্চুয়াল বিশ^ আমার জন্য একটি পথ। এর মাধ্যমে তারা তাদের মতামত জানাতে পারছে। একই সঙ্গে তিনি জেনেভা ভিত্তিক একটি স্থায়ী ভৌত ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেছেন। ডেভিল এন্ড মিস প্রিম, ব্রিদা এবং দ্য উইচ অব পোর্তেবেল উপন্যাস অবলম্বনে টিভি সিরিজ তৈরির উদ্দেশে পহেলা মার্চ, ২০১৮ কোয়েলো একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন বলে জানা যায়।