করোনাকাল
বিচ্ছিন্ন অনুভব
মাহফুজা হিলালী

প্রবন্ধ
অধ্যাপক আনিসুজ্জামান
শামসুজ্জামান খান

গল্প
ডায়মন্ড লেডি ও পাথর মানব
হামিদ কায়সার

গদ্য
নিদ্রা হরণ করেছিল যে বই
মিনার মনসুর

নিবন্ধ
পঞ্চকবির আসর
সায়কা শর্মিন

বিশ্বসাহিত্য
আইজাক আসিমভের সায়েন্স ফিকশন
অনুবাদ: সোহরাব সুমন

বিশেষ রচনা
প্রথম মহাকাব্যনায়ক গিলগামেশ
কামাল রাহমান

শ্রদ্ধাঞ্জলি
মুজিব জন্মশতবর্ষ
মারুফ রায়হান
 
সাক্ষাৎকার
কথাশিল্পী শওকত আলী

জীবনকথা
রাকীব হাসান

ভ্রমণ
ইম্ফলের দিনরাত্রি
হামিদ কায়সার

ইশতিয়াক আলম
শার্লক হোমস মিউজিয়াম

নিউইর্কের দিনলিপি
আহমাদ মাযহার

শিল্পকলা
রঙের সংগীত, মোমোর মাতিস
ইফতেখারুল ইসলাম

বইমেলার কড়চা
কামরুল হাসান

নাজিম হিকমাতের কবিতা
ভাবানুবাদ: খন্দকার ওমর আনোয়ার

উপন্যাস
আলথুসার
মাসরুর আরেফিন

এবং
কবিতা: করেনাদিনের চরণ

১৪ বর্ষ সংখ্যা ০১
আগস্ট ২০২১

লেখক-সংবাদ :





সম্পাদক আবুল হাসনাত
মারুফ রায়হান
আকস্মিকভাবেই চলে গেলেন হাসনাত ভাই, সাহিত্যের সম্পাদক আবুল হাসনাত। আমৃত্যু তিনি সাহিত্যলগ্ন  থেকেছেন। এদেশে পূর্ণকালীন এবং গোটা জীবনের জন্য সাহিত্যনিবেদিত থাকা প্রায় অসম্ভব। শুধু সাহিত্যের সঙ্গে নিজের জীবন জড়িয়ে নিলে যে অর্থনীতির ভিত নড়বড়ে হয়ে যায়, সেটি কি তিনি বুঝতেন না? দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য পাতা সম্পাদনার সমান্তরালে তেমন অর্থকরী কাজও এক-আধটা করেছেন, এটি সত্যি। যেমন গণসাহায্য সংস্থার পাক্ষিক পত্রিকা ‘প্রণোদনা’ সম্পাদনা করতেন ড. হায়াৎ মামুদের সঙ্গে যৌথভাবে। একই হাউসের জেন্ডার ম্যাগাজিন সম্পাদনা সূত্রে কাছ থেকেই তাঁর পেশাদারিত্বের পরিচয় জেনেছি। শুধু পরিকল্পনা অনুযায়ী লেখা সংগ্রহ এবং তা সম্পাদনা করে ছাপাতে পাঠিয়ে দেয়া- পত্রিকার প্রকাশনা এত সহজ নয়। প্রতিটি পৃষ্ঠাকে নান্দনিক করে তোলা, টেক্সটের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক ছবি যোজনা, বিভাগের সমন্বয়সহ একশ একটা কাজ। একজন যোগ্য সম্পাদককে সব দিকেই দৃষ্টি দিতে হয়। এমনকি পত্রিকা ছাপানোর সময় রঙের সুসামঞ্জস্য এবং বাঁধাই-কাটিং সব। পত্রিকার নেশা যার নেই তিনি বুঝবেন না। দৈনিকের একটি বিভাগ চালানো আর গোটা একটা ম্যাগাজিন বের করা, সমমাত্রিক কাজ নয়। আবুল হাসনাতের রক্তে পত্রিকার নেশা না থাকলে এটি সম্ভব ছিল না।
সংবাদপত্রের চরম দুর্দিন শুরু হওয়ার আগে-আগে অবশ্য তিনি কর্পোরেট ভুবনে যুক্ত হন। যদিও সেটাও ওই সাহিত্য সম্পাদনারই কাজ। পূর্বে সম্পাদিত প্রণোদনা ম্যাগাজিনের চাইতে একটুকু কম নয়, বরং নানা বৈশিষ্ট্যে বর্ণিল ও বর্ণাঢ্য। দৈনিক সংবাদে তত্ত্বাবধান করতেন ব্রডশিটে চার পাতা সাপ্তাহিক সাহিত্য বিভাগ। বেঙ্গল ফাউন্ডেশনে গিয়ে জন্ম দিলেন ঢাউশ মাসিক সাহিত্য পত্রিকা কালি ও কলমের। বছরে একাধিক বিশেষ সংখ্যার প্রকাশ ছিল বাড়তি দায়িত্ব। একইসঙ্গে বেঙ্গলে গিয়ে এমন দুটি কর্মযজ্ঞের সঙ্গে তিনি যুক্ত হন যা সংবাদপত্রে থাকলে হয়তো কোনোকালে সম্ভব হতো না। এর একটি হলো তরুণ কবি ও লেখকদের পুরস্কার প্রদান। একটি দুটি নয় পাঁচ পাঁচটি ক্যাটেগরিতে এই পুরস্কার দেয়া হচ্ছে প্রতি বছর। যদিও সিদ্ধান্তটি এসেছিল সম্পাদকীয় সভা থেকে। কিন্তু তাঁর শতভাগ নিবেদন ও সক্রিয় সংযুক্তি ছাড়া কার্যক্রমটি সফল হতো না।
দ্বিতীয় কাজটি হলো বেঙ্গল পাবলিকেশন্সের গ্রন্থ প্রকাশ। কত বিচিত্র ধরনের বই না বেরিয়েছে সেখান থেকে। শিল্পসৌকর্যময় সেসব প্রকাশনা। বাংলাদেশে আর কোনো সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদকের পক্ষে এমন বৃহত্তর পরিসরে নিরবচ্ছিন্নভাবে সাহিত্যের জন্যে কাজ করে যাওয়া সম্ভব হয়নি। এক্ষেত্রে অনন্য ও ব্যতিক্রমী তিনি, বিরল রেকের্ডের অধিকারী। তবে ভুলছি না যে বেঙ্গলে তিনি পেয়েছিলেন ড. আনিসুজ্জামানের মতো একজন অভিভাবকতুল্য সহকর্মী। সেইসঙ্গে মানসম্পন্ন কাজের ধারাবহিকতা রক্ষায় ব্যয় নির্বাহে অকৃপণ একজন পৃষ্ঠপোষকও। কালি ও কলম পত্রিকাটির বয়স আঠেরোয় পড়লো সম্ভবত। পুরস্কার প্রদান ও গ্রন্থ প্রকাশনা- এ দুটি কাজ একদশকের মতোই হবে।
তবে আবুল হাসনাতের সাহিত্য সম্পাদনার সূচনা ছিল ‘গণসাহিত্য’ নামের ছোটকাগজধর্মী সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশের মাধ্যমে। দেশ স্বাধীন হওয়ার কয়েক মাসের ভেতর এটির প্রকাশনা শুরু হয়, চলেছিল অনেকগুলো বছর। তবে এই পত্রিকা সম্পাদনা করার আগে থেকেই আবুল হাসনাত দৈনিক সংবাদে চাকরি করতেন, ভিন্ন বিভাগে। সত্তর দশকের মাঝামাঝি পত্রিকা কর্তৃপক্ষ তাঁকে সাহিত্য বিভাগ সম্পাদনার দায়িত্ব দেন। আগে দু পাতা বের হতো, তিনি দায়িত্বভার গ্রহণের পর সেটি হলো চার পাতা। প্রতি সপ্তাহে চার পাতা কম নয় (ম্যাগাজিন সাইজে বের করলে যা ১৬ পৃষ্ঠা হবে) , তার একটা টাটকা উত্তেজনা আছে। তাঁর ধ্যানজ্ঞান হয়ে উঠলো সাহিত্য বিভাগ। নতুনত্ব আনার জন্যে তাঁর প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলো। প্রতিটি দৈনিক সংবাদপত্রেই তো রয়েছে সাহিত্য বিভাগ। সেখানে স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্যম-িত হয়ে ওঠা সহজ নয়। দুই রঙে ছাপা হতো সাহিত্য পাতা, সুযোগটির সদ্ব্যবহার করলেন তিনি। অঙ্গসজ্জায় নতুন রুচি যুক্ত হলো। রঙের সৃজনী প্রয়োগ এবং শিল্পীদের মননময় তুলি-কলমের স্পর্শ, সব মিলিয়ে নতুন চেহারা পেল সংবাদ সাময়িকী। চিত্র প্রদর্শনীর সমালোচনা এবং শিল্পতাত্ত্বিক আলোচনা তখন পর্যন্ত দৈনিকের সাহিত্য পাতায় অনুপস্থিত ছিল। এটি যোগ করলেন সম্পাদক আবুল হাসনাত। সাহিত্যিকদের পাশাপাশি সরাসরি শিল্পীদেরও কৌতূহলী করে তুলেছিল সংবাদ সাময়িকী। প্রতিষ্ঠিত প্রায় সব লেখকেরই লেখা ধারণ করতে সমর্থ হতো সংবাদ সাময়িকী। এখানে পুরো কৃতিত্ব দিতে হবে সম্পাদক আবুল হাসনাতকেই।
তবে তিনি ভুল বোঝাবুঝিরও শিকার হয়েছেন। তাঁর মিতভাষিতাকে অহম বলে ভুল ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। সংবাদ অফিসে যারা গেছেন তারা দেখেছেন সেই সময়ে একটু সঙ্কুচিত পরিসরই ছিল দপ্তরে। সাহিত্য সম্পাদকের টেবিলের সামনে কোনো চেয়ার থাকতো না। ফলে কোনো লেখক সেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা দেবার সুযোগ পেতেন না। অচেনা কেউ লেখা দিতে এসে বিব্রত বোধ করলে অস্বাভাবিকও বলা যাবে না। কেননা আবুল হাসনাত অনেক সময় নিজ হাতেও লেখা গ্রহণ করতেন না, বলতেন, রেখে যান আমি দেখবো। লেখককে টেবিলের ওপরে রেখেই প্রস্থান করতে হতো। এ বিষয়ে আজ লেখক আহমাদ মোস্তফা কামাল স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে যা লিখেছেন তার কিছু অংশ তুলে ধরলে বুঝতে সুবিধে হবে।  তিনি লিখেছেন: ‘আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, নিতান্তই তরুণ লেখক, প্রথম লেখাটি নিয়ে গিয়েছিলাম ১৯৯৪ সালে। বিশাল এক লেখা। তাঁর সামনে বসার জন্য কোনো চেয়ার ছিল না, বসতে বলেনওনি, এমনকি একটু হাসেনওনি, লেখাটি হাতে নিয়ে শুধু এটুকু বলেছিলেন - রেখে যান, আমি পড়ে দেখবো। মন খারাপ হয়েছিল। চা খাওয়ানো দূরের কথা, বসতেও বললেন না, একটু আলাপও করলেন না! এ কেমন মানুষ! কিন্তু  পরের সংখ্যাতেই দুই পৃষ্ঠা জুড়ে সেই বিশাল লেখাটি ছেপে দিয়েছিলেন।’ এ বিবরণ থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে সম্পাদক হিসেবে তাঁর সততার বিষয়টিই।
কোন লেখার জন্যে কতোটা জায়গা দেবেন, সাজানোয় কতোটা গুরুত্ব দেবেন, এটি সব সময় কি লেখকের নাম দেখে নির্ধারিত হয়ে থাকে? নব্বুই দশকে আমি তরুণ লেখকই ছিলাম। যে কয়টি প্রবন্ধ ও সাক্ষাৎকার দিয়েছি তাঁর হাতে সবগুলোই তিনি লীড করেছেন, সাহিত্য বিভাগের প্রথম পাতার আট কলাম জুড়েই সাজিয়েছেন। তার মানে এই নয় যে আমাকে তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি দেখেছেন রচনার বিষয় ও তাৎপর্য। সেইসঙ্গে পাঠকের আগ্রহের দিকটিও।
সাহিত্য সম্পাদক আবুল হাসনাতের সঙ্গে রূঢ় আচরণ নিশ্চয়ই কেউ কেউ করেছেন। অন্তত একটির কথা আমি জানি। তাঁর খুব বেশি ফোন পাইনি সংবাদে তিনি কাজ করার সময়ে। বরং কালি ও কলম পত্রিকার জন্যই বেশ অনেকবার ফোন করেছেন। সংবাদ কার্যালয় থেকে ফোন করে বললেন, জরুরি আলাপ আছে, আমি সন্ধ্যায় তাঁর বাসায় যেতে পারবো কিনা। প্রথমবারের মতো গেলাম পুরনো ঢাকায় তাঁর বাড়িতে। খুব মন খারাপ নিয়ে যা জানালেন তার সারকথা এমন: আমাদেরই সমবয়সী বন্ধুস্থানীয় একজন তাঁর সঙ্গে অত্যন্ত গর্হিত আচরণ করেছেন যা তাঁকে পীড়ন করছে। বুঝলাম আমার সঙ্গে কথা বলে একটু হালকা হওয়া এবং আমাদের প্রজন্মের লেখকদের মনমানসিকতা সম্পর্কে ধারণা লাভ- এই ছিল তাঁর আরাধ্য। ইতোমধ্যে ‘মাটি’ নামের সাহিত্য পত্রিকা ছাড়াও দৈনিক বাংলার বাণীর সাহিত্য বিভাগ সম্পাদনার অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে ফেলেছি। তাই হয়তো ভেবেছিলেন আমার সঙ্গে আলাপচারিতার ভেতর দিয়ে তাঁর মনোপীড়নের শুশ্রƒষা হবে।
আজ তাঁর প্রয়াণের পরে হয়তো আমরা অনুধাবনে সক্ষম হবো একজন সম্পাদক থাকেন টেবিলের একপাশে একা, আর বিপরীত দিকে থাকেন সমগ্র লেখকসমাজ, পাঠকভুবন। সৎ নিষ্ঠ সাহিত্য সম্পাদক উৎকৃষ্ট সাহিত্য আলোয় আনার জন্যে আন্তরিকভাবে নিরলস কাজ করে যান। তাঁর অবদানকে অস্বীকার করে তাঁকে বিচিত্র উপায়ে বিপর্যস্ত করার মধ্য দিয়ে সাহিত্যের কখনো কোনো উপকার অর্জিত হয় না।
কবি ও চিত্রসমালোচক পরিচয় ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠেছিল তাঁর সম্পাদক পরিচয়টিই। সম্ভবত স্বাধীনতা-উত্তর মোহ ও লোভহীন প্রাজ্ঞ সাহিত্য-সম্পাদনাধারার শেষ প্রতিনিধির অন্তর্ধান ঘটলো আবুল হাসনাতের জীবনাবসানের ভেতর দিয়ে। তাঁকে অন্তিম অভিবাদন।